কবি তাদেউজ রজেভিচ
শংকর ব্রহ্ম

      
                 পোলিশ ভাষার কবি তাদেউজ রজেভিচ (Tadeusz Rozewicz) জন্মেছিলেন রাদোমস্কো, সদ্য স্বাধীন হওয়া পোল্যান্ডে ৯ই অক্টোবর ১৯২১ সালে।
                 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড আবার জার্মানীর পদানত হয়। তখন তদিউস আর তার বড় ভাই জানিউস (যিনি নিজেও প্রতিভাবান কবি ছিলেন) দুজনেই প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দেন।জানিউস গেস্টাপেদের হাতে ধরা পড়েন আর তাঁকে হত্যা করা হয়। তদিউস বেঁচে যান। সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তাঁর সব কবিতাতে ছায়া ফেলেছে।
              প্রতীক, উপমা, শব্দব্যবহারের অভূতপূর্ব কলাপ্রকৌশলে পোলান্ডের কবিতার তথাকথিত লিরিকময়তাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন তিনি। খুবই শক্তিশালী, অন্তর্ভেদী তার দৃষ্টি আর উপস্থাপনা। তিনি বলেছেন, “কবিতার তথাকথিত ছন্দোস্পন্দের বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বন্দিশিবির সৃষ্টির মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে।” যুদ্ধের বীভৎসতা, নির্যাতন আর যুদ্ধপরবর্তী সময়ের সংকট ও অপ্রাপ্তিকে তিনি তার কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। রজেভিচকে মনে করা হয় যুদ্ধোত্তর পোলিশ কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তবে শুধু কবি নন, তিনি পোলিশ ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার, সমালোচক ও ছোটগল্পের রচয়িতা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি এখন বিশ্ব জোড়া। ২০১৪ সালে তদিউস মারা যান।
               পশ্চিমের অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রূঢ় বাস্তবতা আর নির্মমতার পর কী ভালো কবিতা রচনা করা সম্ভব? বিশেষ করে রাজনীতি যেখানে প্রধান ও প্রখর হয়ে ওঠে? রজেভিচ পোলিশ কবিতার ইতিহাসে ‘চতুর্থ সাহিত্য ঘরানা’র সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি ও নির্মমতার ভেতর থেকেও নিয়ন্ত্রিত শৈলী, পরিমিত শব্দ ব্যবহার, অন্তর্গত অনুভবকে অবলম্বন করে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব। কাব্যজীবনের প্রাথমিক পর্বে এই ধরনের কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই পোলিশ সাহিত্যভুবনে তার আবির্ভাব ঘটে উদ্বেগ (১৯৪৭) ও লাল দস্তানা (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
    জীবনের প্রথম দিকে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন রজেভিচ। গেস্টাপো বাহিনী তার বড়ো ভাইকে খুন করে, এই ভাইয়ের স্মৃতি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি; নিজেও মৃত্যুর প্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিলেন। কবিতায়, গল্পে, এমনকি নানা ধরণের গদ্যে সেই নির্মমতার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। ফলে সমকালসম্পৃক্ত, আপাত অগভীর কবিতা রচনা করাই ছিল তার জন্যে স্বাভাবিক, কিন্তু তিনি প্রচলিত পথে না হেঁটে রচনা করতে থাকেন অন্তর্গত সংবেদনশীল কবিতা। তারই মাধ্যমে অস্তিত্বের জন্যেই বেঁচে থাকা—পোলিশ কবিতার ধারায় সংযুক্ত হলো এই নতুন সংবেদনশীলতা। শূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়ে উঠলো তার কবিতার মর্মকথা। পরবর্তী সময়পর্বে রচিত রাজপুত্রের সঙ্গে কথপোকথন (১৯৬০), অনামা কণ্ঠস্বর (১৯৬১), একটি মুখ (১৯৬৪) তৃতীয় মুখ (১৯৬৮) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে এই বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।
          রজেভিচের সময়ে আভাঁগার্দধর্মী কবিতার ধারাটি পোলান্ডে বেশ শক্তিশালী ছিল। এই ধরণের কবিতায় সরাসরি উপমা, বাক্প্রতিমা, শব্দের ব্যবহার ঘটতো। রজেভিচ সেই পথে না হেঁটে রচনা করেছেন মানব অস্তিত্বের স্মারক হয়ে উঠতে পারে এমন সব কবিতা, যা তার কথায় হয়ে উঠেছে জন্মের কার্যকারণ আর মৃত্যুর কার্যকারণে পরম্পরিত জীবনবেদ। কবিতায় এই জীবনের কথা সবটা বলা সম্ভব নয় ভেবে এই সময় তিনি গড়ে তোলেন ‘মুক্তমঞ্চ’, লিখে ফেলেন বেশ কিছু নাটক—কার্ডে লিপিবদ্ধ নির্ঘণ্ট (১৯৬৮), উপবিষ্ট অপেক্ষমান বৃদ্ধা (১৯৬৯), সেই চারজনকে নিয়ে (১৯৭২) ইত্যাদি।
            সমালোচকদের মতে তার কানটি প্রখর, অর্থাৎ তার শ্রবণদক্ষতা ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। সমকালের নন্দনরীতি সম্পর্কে তিনি যেমন ছিলেন সচেতন, তেমনি সৃষ্টিশীলতার কোন নতুন রাস্তায় তাকে হাঁটতে হবে, সেটাও তিনি বেশ ভালোই জানতেন। নারীবাদ ও উত্তর-আধুনিকতার দ্বারা স্পৃষ্ট হয়ে এভাবেই তিনি রচনা করেন কাব্যগ্রন্থ 'শ্বেতবিবাহ' (১৯৭৫)।
                  রজেভিচ এখন আর আগের মতো সৃষ্টিশলিতায় সক্রিয় নেই, তবে তিনি লিখে চলেছেন তার কবিজীবননির্ভর আত্মজীবনী। কবিতা ও জীবন যে একাকার হয়ে থাকে, সেটাই হচ্ছে এই আত্মজীবনীর মূল বিষয়। রজেভিচ এমন এক কবি যিনি কবিতার সংজ্ঞাকে অগ্রাহ্য আর প্রবলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। কবিতার যত ধরনের তথাকথিত ফাঁদ আছে, তার সবগুলো তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। তাকে তাই বলা হয় নৈঃশব্দ্যের কবি, সংবেদনার কবি। অনেকে তাকে ‘প্রায়-মিস্টিক’ কবি বলেও আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ধ্রুপদী আভাঁগার্দ কবি হিসেবেও পরিচিত, উত্তর-আধুনিক কবির শিরোপাও জুটেছে তার।
         যে'ভাবেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, রজেভিচের স্বর ও কাব্যশৈলী সরল কিন্তু স্নায়ুক্ষয়ী, সন্ত্রাস আর শূন্যতাকে তিনি ধরতে পারেন সহজেই। তিনি বলেছেন, আমার লক্ষ্য “পদ্য লেখা নয় ঘটনার বিবরণ দেয়া।” কিন্তু দেখা গেছে এই ঘটনার বিবরণই হয়ে উঠেছে এক-একটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অভূতপূর্ব কবিতা। তার শেষের দিকের লেখায় মানবজীবনের দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, হতাশা, আনন্দ, বেদনার ছবি বেশ স্পষ্ট। কবিতায় নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আরেক পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ তাকে এসব কারণে চিহ্নিত করেছেন নৈরাজ্যের কবি বলে, “রজেভিচ হচ্ছেন নৈরাজ্যের কবি যিনি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতাকে বিন্যস্ত করে কবিতা লিখতে ভালোবাসেন।”
             এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৪টি। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে।