নানান বরণ গাভীরে একই বরণ দুধ
জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।
— গাজীর গান
শিমুলতলি গাঁয়ে;
গাছের পাতা বাতাস করে মাটির শীতল ছায়ে
নমু মুসলমানের আবাস, গলায় গলা ধরি
খোড়ো ঘরের চালগুলি সব হাসছে মরি মরি।
নমু পাড়ায় পূজা পরব, শঙ্খ কাঁসর বাজে;
বউ-ঝিরা সব জয় জোকারে উৎসবেতে সাজে।
মুসলমানের পাড়ায় বসে ঈদের মহোৎসব,
মেজবানী দেয় ছেলে বুড়োয় করিয়ে কলরব।
মোরগ ডাকে মুরগী ডাকে পেঁয়াজ রসুন বাটি
তরকারিতে দেয় যে ফোড়ং, বাতাস হলে ভাটি।
নমু পাড়ার গন্ধ তাহার যায় যে মাঝে মাঝে;
এতে তাদের হয় না ব্যাঘাত কোন রকম কাজে।
চড়ক পূজায় গাজন গাহি নাচে নমুর দল।
চৈতী ঢাকের বাদ্য বাজে, গাঁও করে টল্ মল্।
কীর্ত্তনেতে তুলিয়ে বাহু জাগায় কলরোল
মসজিদে তার বাজনা গেলে হয় না কোন গোল।
বরং সেথা মাঝে মাঝে ইহাও দেখা যায়
হিঁদুর পূজায় মুসলমানে বয়েৎ গাহেন গায়।
সরস্বতী পূজার লাড়ু গড়িয়ে দু-চার জোড়া।
মুসলমানের ঠোঁট ছুঁয়েছে তাও দেখেছি মোরা।
ছোঁয়া ছুঁয়ির এতই যে বাড়, পীরের পড়া জল
নমুর পোলার পীড়ার দিনে হয় নি তা বিফল।
দরগা তলায় করতে প্রণাম ভালের সিন্দুর দিয়ে
নমুর মেয়ে লাল করে যায় শুকনো মাটির হিয়ে।
নমু বাড়ীর তমাল তরু মেলি চিকন ডাল
মুসলমানের উঠান বেড়ে' দুলছে চিরকাল।
মোল্লাবাড়ীর জাঙলা হ'তে ঢাকাই সীমের লতা
ভাজন নমুর ঘরটি ধরে কইছে মনের কথা।
কিবা নমু কি মুসলমান কারো তরফ হ'তে
ইহার কোন প্রতিবাদই হয় নি কোন মতে।
গরীব তারা, ছোট-খাটো সুখ দুঃখ লয়ে
শিমুলতলি গাঁয়ের মাঝে আছে যে এক হয়ে।
মুসলমানের মরলে ছেলে যে দুখ সহে মায়,
নমু মেয়ের তুলসীতলায় প্রদীপ দোলে তায়।
স্বামীরে তার চিতায় দিয়ে বিধুর নমু-নারী,
শ্মশান ঘাটায় শঙ্খ সিদুর যায় যখনে ছাড়ি,
তখন তাহার আপন জনের যেমনি ব্যথা হয়,
মুসলমানী সখীর ব্যথা কম তাহ'তে নয়।
কবরে যে ঘুমায় ব্যথা চিতায় যে তুখ জ্বলে,
এক হয়ে তা নমু মুসলমানের বুকে দোলে।
এ সব তারা শিখল কোথা? কোরান পুরাণ পড়ে
পায় নি ইহার হদিস তারা বলছি শপথ ক'রে।
মাথায় তাদের একই আকাশ দোলায় নীলের মায়া,
একই বাতাস দোলায় তাদের বনের কাজল ছায়া।
মাঠ তাহাদের সমান ঢালু, বৃষ্টি পড়া জল
এদিক থেকে গড়িয়ে ওদিক করে যে টলমল।
মুসলমানের বেড়ার ফাঁকে যে চাঁদ পশে ঘরে
নমুর উঠান বেড়ি সে চাঁদ নিতুই খেলা করে।
তেমনি এরা একের ব্যথা লয় যে সবার ভাগে
একের ঘরের সুখের দোলা আরের ঘরে লাগে।
নমুর মধ্যে নমুর সেরা গদাই মোড়ল নাম,
দেখতে যেমন নামেও তেমন—তেমন তাহার কাম।
বড় ঘরের চালের আগা আকাশ ছুঁতে চায়,
সুপুরি গাছ বাড়িয়ে বাহু বারণ করে তায়।
আথালে তার দশটি বলদ, চারখানা বায় হাল
দশটি রাখাল সামাল সামাল রাখতে তাদের তাল।
গরব তাহার মস্ত বড় আছে ধানের গোলা,
আর আছে তার জোয়ান জোয়ান সাতটি ভাজন পোলা
আরেক গরব গিন্নী আছেন, হয়ত বা ভুল করে
লক্ষ্মী দেবী নিজেই বাঁধা পড়েছে তার ঘরে।
পাড়ায় পাড়ায় কোঁদল করে; যে ধারে তেল নুন,
ফেরেন তিনি মল বাজায়ে গেয়ে তাহার গুণ।
পান হ'তে তার চুণ খসাবে এমন বাপের ছেলে
শপথ করে বল্তে পারি দশ গাঁয়ে না মেলে।
সাত ঘাটে জল এক ক'রে সে ভরতে পারে ঘড়া;
পাতাল পুরীর সংখ্যা বালির নখেতে তার পড়া।
আরো গরব আছে যে তার হাতের লাঠি খানি,
থাকতে হাতে ভয় করে না কোনই জন-প্রাণী!
ইহার চেয়েও গরব তাহার লক্ষ্মী মেয়ে ঘরে,
দুলালী নাম, দুলী বলেই ডাকে আদর করে।
সারাটা দিন খেলেই বেড়ায়, এঁদো পুকুর কোণে
বনবাদাড়ে ফুল কুড়ায়ে ফেরে সখীর সনে।
পায়ে তাহার কাঁসার খাড়ু ঝামুর ঝুমুর বাজে;
সারা ক্ষণই ব্যস্ত আছে নানান রকম কাজে।
পুতুল গুলির অন্নপ্রাশন, কুকুর ছানার বিয়ে,
দিন যে তাহার যায় এমনই কত না কাজ নিয়ে।
বলেছি ত সকল কাজেই সোজন তাহার জুড়ি;
হাজার খেলার ফন্দী আঁটে সারাটি গাঁও ঘুরি।