প্রবীণের নবীনকে অনুরাগ ভরা হৃদয়ে আগামীর শুভেচ্ছা এবং নবীনের প্রবীণের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন l
তাজমহল তৈরি করেছিলেন সম্রাট শাজাহান l তৈরির উপলক্ষ্য ছিলো সম্রাটের স্ত্রী মমতাজ বেগম ও তাঁর প্রতি সম্রাটের ভালবাসা l আজ সম্রাট শাজাহানও নেই, মমতাজ বেগমও নেই, কিন্তু তাজমহল আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল l অর্থাৎ সৃষ্টি স্রষ্টা থেকেও বড়ো l আবার এটাও বলা যায়, সৃষ্টি তার উপলক্ষ্যকে,  স্রষ্টাকে অমর করে রাখে l তাজমহলের কথা পাড়লেই স্বাভাবিক ভাবেই তার উপলক্ষ্য মমতাজ মহল ও তার স্রষ্টা শাজাহানের কথা এসে যায় l
কবিগুরুর "১৪০০ সাল" কবিতার জবাবে কাজী নজরুল ইসলাম কবির জীবদ্দশাতেই জবাবী কবিতাটি লেখেন l আজ কবিগুরুও নেই, কাজী নজরুলও নেই - কিন্তু গুরু-শিষ্যের অমর সৃষ্টি যেন তাজমহলের শ্বেত পাথরের মতো সমান উজ্জ্বল, অমর সৃষ্টি হয়ে আছে l আর সেই সৃষ্টির মধ্যেই বেঁচে আছেন গুরু-শিষ্য সম কবিদ্বয় বাঙলার হৃদয়ে l
কবিগুরু ১৩০২ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬-১৮৯৭ খৃষ্টাব্দ) ফাল্গুন মাসে রচনা করেন "১৪০০ সাল" কবিতাটি l "আজি হতে শত বর্ষ পরে" বলছেন বটে, কিন্তু উদ্দিষ্ট ১৪০০ সাল তখন থেকে ঠিক ৯৮ বছর পর আসে l কবি আগামীর কবি ও পাঠককে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং কামনা করেছেন ১৪০০ সনের বসন্তকালে যে কবিতা রচনা হবে, যে সঙ্গীত গাওয়া হবে, তার মধ্যে তার রচিত বসন্ত গানও বুঝি গাওয়া হবে l
১০০ বছর অতিবাহিত হয় নি l ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে (১৯২৮-১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ) অর্থাৎ কবিগুরুর রচনার ঠিক ৩২ বছর পর যখন কবির বয়স প্রায় সত্তর এর কাছাকাছি তখন অনুজ কবি কাজী নজরুল ইসলাম আগামীর পাঠক ও কবি সমাজের প্রতিনিধি হয়ে কবিগুরুর কবিতাটির জবাবী কবিতাটি লেখেন l নজরুলের রচনার প্রতি ছত্রে রয়েছে অগ্রজ কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অন্তরের প্রেম ও ভালবাসা l বাতায়ন খুলে যায় l গুমরে কাঁদে উচাটন বসন্তের বাতাস l রবীন্দ্রনাথ চির যৌবনের দূত রূপে কাব্য হয়ে, গান হয়ে স্বপ্নে দেখা দেন তার অনুরাগী পাঠকদের, নতুন প্রজন্মের কবিদের l
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি অমর l শতবর্ষ পরেও তরুণ কবিরা কবির মাধবীবাসর জাগে l রাতে সুগন্ধি ফুল ফোটে এবং কবির গান গাওয়া হয় l শতবর্ষ পরেও তরুণ কবিরা রবিকবির বন্দনা করে l স্বপ্নে রবি কবির গান ভেসে আসে l নতুন প্রজন্ম কবির বসন্ত বাসরে কবির বসন্ত গান গায় l
অপূর্ব সঙ্গীত মূর্ছনাময় কবিতা l অনুজ কবির শ্রদ্ধা অগ্রজ কবিকে l
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গুরু শিষ্যের মতো l সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সর্বদা হয়তো সহযাত্রী ছিলেন না l দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পার্থক্য ছিলো l কিন্তু অনুজ কবির প্রতি কবিগুরুর ছিলো অসীম স্নেহ এবং সঙ্গে ছিল তার কবি-প্রতিভার যোগ্য স্বীকৃতি l আর নজরুল চিরকাল রবীন্দ্রনাথকে বাংলার শ্রেষ্ঠ ও অগ্রজ কবি হিসেবে গুরুর আসন দিয়ে এসেছেন l নজরুল যখন ইংরেজ শাসক বিরোধী এক রচনার জন্য শাস্তি পেয়ে জেলে আছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচিত "বসন্ত" গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন l জেলের মধ্যে নজরুল যখন তাঁকে উৎসর্গ করা "বসন্ত" গীতিনাট্য  টির একটি কপি হাতে পেয়েছিলেন, কবিগুরুর উপহার হিসাবে, তখন, নজরুল স্বীকার করেছেন, জেলের মধ্যে যে নির্যাতন, অত্যাচার তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল, তার যন্ত্রনা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন l নজরুলও তাঁর "সঞ্চিতা" কাব্যগ্রন্থটি কবিগুরুকে উৎসর্গ করেছিলেন l রবীন্দ্রনাথের "গোরা" উপন্যাস অবলম্বনে যখন ছায়াছবি নির্মিত হলো, কাজী নজরুল ছিলেন তার সঙ্গীত পরিচালক l রবীন্দ্রনাথের অনুগামী অনেকের এ ব্যাপারে আপত্তি ছিলো l কিন্তু সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করে রবীন্দ্রনাথ এই দায়িত্ব নজরুলকে দিয়েছিলেন l
প্রায় একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্য জগৎ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে হারায় l ইংরাজি ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ হয় l তখনও নজরুল সাহিত্য চর্চায় সক্রিয় l প্রয়াত কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নজরুল কিছু কবিতা-গান  রচনা করেন l কিন্তু বছরখানেকের মধ্যেই দুরারোগ্য অসুখে তিনি আক্রান্ত হন l ধীরে ধীরে তিনি নির্বাক, নিশ্চল হয়ে পড়েন l
অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই প্রধান সেবকের সেবা থেকে বঞ্চিত হন বাংলার সাহিত্য দেবী l
কিন্তু আজও তাঁদের সৃষ্টি রয়ে গেছে আমাদের মধ্যে l স্রষ্টা বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে l এক কবির রচিত গান আমাদের দুই বাঙলার জাতীয় সঙ্গীত, আর একজন এক দেশের জাতীয় কবি, তার সঙ্গে দুই বাঙলার হৃদয়ের কবি l
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম দুজনই ছিলেন দিকপাল কবি l সমসাময়িক ছিলেন l বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই দুজন কবি তাঁদের অসংখ্য কালজয়ী রচনার দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে এক অসামান্য উচ্চতা দান করেছিলেন l রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন ১৯১৩ সালে l আর জেলে থাকা অবস্থায় নজরুল যখন তাঁকে উৎসর্গ করা রবীন্দ্রনাথের "বসন্ত" গীতিনাট্যের কপিটি হাতে পেলেন, তাঁর কাছে সেটি নোবেল পুরস্কারের চেয়ে কিছু কম ছিল না l রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "নজরুল বাংলা সাহিত্যে বসন্ত নিয়ে এসেছে l তাই "বসন্ত" গীতিনাট্যটি ওকেই উৎসর্গ করলাম l"
কিছু ব্যাপারে তাঁদের দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য ছিলো না এমন নয়, কিন্তু সে সবকে ছাড়িয়ে গেছে তাঁদের পারস্পরিক স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক l
প্রায় একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্য জগত থেকে তাঁরা বিদায় নেন l কিন্ত আজও কোনো রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে এই দুই কবি আমাদের কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, আমাদের হৃদয়ে বেজে ওঠেন l
শত বর্ষ কেন, যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল চিরকাল বাঙালী হৃদয়ে অমর থাকবেন l