পরাবাস্তবতা বিষয়টা কি ? বাস্তবকে এড়িয়ে যাওয়া ? না পুরোপুরি তা নয় l এটি হচ্ছে স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যে যে বিরোধ তার একটি সমন্বয় চেষ্টা l এখানে এমন সব চিত্রকল্প সৃষ্টি করা হয় বাস্তবের সঙ্গে যা মেলে না l যেমনটা অবচেতন মনের প্রভাবে আজগুবি সব ইমেজ আমরা স্বপ্নে দেখে থাকি, যখন চিন্তার প্রবাহ যুক্তির পথ ধরে চলে না l কিন্তু একটা সময়ে এই স্বপ্নকে বাস্তবের সঙ্গে অন্বিত করতে হয় l একে বলা হচ্ছে পরাবাস্তব l
রূপ-রস-গন্ধময় পার্থিব অনুভূতিকে ছাড়িয়ে অবচেতনজাত স্বপ্নময় চিত্রকল্প নির্মাণ হয় l পরাবাস্তব জগতের অলৌকিক ইশারা চিত্র অঙ্কনে, কবিতা রচনায় আসে l স্যুর্‌রিয়ালিজ্‌মের মধ্যে একটা আপাত ধোঁয়াশা থাকে l কবিতায় এমন সব চিত্রকল্প ব্যবহার করা হয় বাস্তবের সঙ্গে তার যোগ নেই l ফলে কবিতার অর্থ বোঝা যায় না l আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব লক্ষ্য করা যায় l কবি কি বলতে চেয়েছেন, বোঝা কঠিন হয় l
কিন্তু পরাবাস্তবতার প্রয়োগও শর্তাধীন l বলা হয়, বাস্তবতাকে তুলে ধরতেই পরাবাস্তবতার আশ্রয় নেয়া হবে l এই শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো যে, অবচেতনজাত কল্পনা তখনই শিল্পসাহিত্যে গ্রহণযোগ্যতা পাবে যখন তা বাস্তবতাকেই শিল্পিতভাবে প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হবে।
সুররিয়েলিজম ধারার আধুনিক কবিতা কেবলই
বিমূর্ত ভাব রেখে যায় l মোটেই  মূর্ত হতে চায় না। এক একজন তার এক একরকম ভাব ও অর্থ করেন!


সুরিয়ালিজম' বা 'পরাবাস্তবতা' বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের এক অন্যতম উপাদান। মানুষের মনের চেতন ও অচেতন অবস্থার অতিরিক্ত যে একটি অবচেতন বিরাজ করে সেই অবচেতনের গহ্বর থেকে উঠে আসা বাস্তবের অধিক বাস্তব আপাত অবাস্তবই পরাবাস্তবতা। অর্থাৎ অবচেতন মনের ক্রিয়া-কল্পনা নির্ভর সাহিত্য হচ্ছে পরাবাস্তব সাহিত্য। ফরাসী সাহিত্যিক গিওম আপলেনিয়ের (১৮৮০-১৯১৮) ১৯১৭ সালে তার 'টাইরেসিয়াস-এর স্তন' নাটক প্রসঙ্গে প্রথম 'সুরিয়ালিস্ট' শব্দটি ব্যবহার করেন l সুতরাং সাহিত্যের ক্ষেত্র থেকেই 'পরাবাস্তব' অভিধাটির সূচনা। কিন্তু ইউরোপ বিশেষত প্যারিসে চিত্রকলা, ভাস্কর্য প্রভৃতি ক্ষেত্রেও 'পরাবাস্তবতা' সঞ্চালিত হয়েছে l জার্মান ও ইংরেজি সাহিত্যের ধারাও পরাবাস্তবতাকে প্রসারিত করেছিল।
পরাবাস্তবতার সঙ্গে আমরা কমবেশী সবাই পরিচিত l মানুষের রয়েছে চিন্তা ও কল্পনা করার ক্ষমতা l  বস্তুজগতের অন্য কিছুর কিন্তু তা নাই। এই কল্পনা দিয়ে আমরা একেকটা জগত সৃষ্টি করতে পারি l বস্তুজগতের অনেক কিছু বা আমাদের পরিচিত ব্যক্তিদের আমরা স্বপ্নে দেখি। স্বপ্নে দেখা বস্তুগুলো বা ব্যক্তিগুলো বাস্তব থেকে উঠে আসা l কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে সেই চরিত্রগুলির যে আচরণ, তাদের নিয়ে যে ঘটনাক্রম তা অবচেতন মনের পরিচালনাধীন l সেখানে না থাকে সময়ের বাঁধন, না যুক্তির শাসন, না চরিত্র ও সময়ের সঙ্গে সমন্বয়কারী স্থান l অর্থাৎ স্বপ্নে এক পরিচিত ব্যক্তিকে আমরা এমন একটি স্থানে দেখছি, যেখানে তার থাকার কথা নয়, এমন সময়ে দেখছি যে সময়ে তার অস্তিত্ব হয়তো নেই, অর্থাৎ কোনো মৃত ব্যক্তিকে হয়তো জীবন্ত অবস্থায় দেখছি l এই যে অসঙ্গতি, জাগ্রত অবস্থায় এই অসঙ্গতি আমাদের যুক্তিবোধের কাছে ধরা পড়ে l কিন্তু স্বপ্নে অবচেতন মনে যুক্তির শাসন নেই l তাই এই আজগুবি দর্শন অনুমোদন পেয়ে যায় l


এইভাবে স্বপ্নের মধ্যে দেখা চরিত্রগুলো বাস্তবে থাকলেও কল্পনার জগতে তাদের আচরণ ভিন্ন l  তাই এগুলো বাস্তব হলেও প্রকৃতপক্ষে বাস্তব নয় l তাই বলা হচ্ছে পরাবাস্তব। একটা পরাবাস্তব জগৎ সৃষ্টি হয় l বস্তুজগতে অবস্থান করে পরাবাস্তব জগতের কল্পনা করা। এই ক্ষমতা একমাত্র মানুষেরই আছে l  


পরাবাস্তবতা সাহিত্যে চিরকাল ছিল l আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রহমান পরাবাস্তবতাকে বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন l
এমন ব্যবহার নজরুলও করেছেন –
“আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই, সেই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি...” অথবা
“মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোঁপায় তারার ফুল,
কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথীর চৈতি চাঁদের দূল...”
কবিগুরুও এমন সৃষ্টি রেখেছেন l "সোনার তরী" কবিতায় পরাবাস্তবতার ছোঁয়া আছে l এই কবিতার অর্থ নিয়ে প্রচুর মতভেদ হয়েছে l কবিতার গল্পটি খুব সরল l কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ গভীর l সেটি পরাবাস্তব চিত্রকল্প ব্যবহারের জন্য l
কিন্তু তার পরও  ট্রাডিশনাল কবিতা পাঠক বুঝতে পারেন, উপভোগ করেন। সেখানে কিছু টেক্সট থাকে যা কিছু পরিস্কার বার্তা  দিয়ে যায়। এছাড়াও, ট্রাডিশনাল কবিতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাব্যের অর্থ যখন স্পষ্ট করে আয়ত্ত করা যায় না, তখনও কাব্যরস অবচেতনায় মনকে স্পর্শ করে যায়। সার্থক কবিতার সার্থকতা তো এখানেই।

পরাবাস্তবতার বিকাশে পূর্ববর্তী একটি আন্দোলন 'দাদাবাদ' এর ভূমিকা ছিল l সুইজারল্যান্ড তার জন্মভূমি l রোমান্টিক যুগের শিল্প ও কাব্যকলার এক-ঘেঁয়েমি থেকে মুক্তিলাভের অজুহাতে ত্রিস্তা জারা'র পৌরোহিত্যে পাশ্চাত্যের একদল কবিচিত্রকর "দাদাবাদ" নামের সেই আন্দোলন শুরু করেন। দাদাবাদে ছিল অতিকল্পনার চমক। সে-কল্পনা ছিল লাগামহীন l বাস্তবতার শাসনরহিত। যুক্তি ছিল, মানুষের অবচেতন মন কোনো শাসন মানে না। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুতবেগে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দাদাবাদী হুজুগ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি l কারণ, দাদাবাদ ঐতিহ্যকে  বিনাশ করেছিল, কিন্তু গ্রহণযোগ্য বিকল্প  সৃষ্টি করতে পারেনি। চিত্রশিল্পে এলোমেলো রঙের বিন্যাস, নিটোল চিত্রকর্মেও যথেচ্ছ বিনাশী উপাদানের সংযোজন এবং কবিতায় উন্মাদের প্রলাপকেই রোমান্টিক যুগের সংহতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন দাদাবাদীরা। ফলে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় নি l তখন সেই দলেরই কয়েকজন, আঁদ্রে ব্রেতো ও মাক্স আর্নস্ট শুরু করলেন 'পরাবাস্তবতাবাদ' নামের আরেকটি আন্দোলন l জার্মান কবিচিত্রকর ইভান গল ঘোষণা করলেন, পরাবাস্তব কবিতা বা চিত্রকর্মকে বাস্তবতার সঙ্গে অন্বিত হতে হবে। ইভান গলের যুক্তিই সর্বজন গৃহীত হল এবং কবিতারাজ্যের প্রতিভাবান স্রষ্টাদের হাতে পরাবাস্তবতা সুসংহত হয়ে পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠল।
দেখা গেল, এটি অনুভূতির রাজ্যকে প্রসারিত করেছে l মোটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যমান জগতের বাইরে থেকে চিত্রকল্প সংগ্রহ করার পথ প্রশস্ত হয়েছে l সীমিত অনুভূতির বলয় থেকে কবিতা ও চিত্রকর্মকে মুক্তি দিয়েছে।