৩৮.
প্রথমে কবিতায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ যা রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হয়েছে এবং যেগুলি পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত এবং কবিতাটির পাঠোদ্ধারের সহায়ক সেরকম শব্দগুলি চিনে নিই l  
মশারি = বাবা = নিশ্চিন্ত আশ্রয়
রাতের মশা = দিনের ভূত = সাংসারিক আপদ
সন্তানের কাছে বাবা এক নিশ্চিন্ত আশ্রয় l সেই নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে সন্তান সমস্ত দুশ্চিন্তামুক্ত l তাই কাদাঘুমে আচ্ছন্ন l মশা যতই গুঞ্জন করুক সারা রাত l তারপরেও তারা রক্ত অর্থাৎ খাদ্যের কাঙাল, অর্থাৎ সন্তান বিপদমুক্ত l মশারি তথা বাবা ঢাল হয়ে ঘুমন্ত, নিশ্চিন্ত সন্তানকে রক্ষা করে l


তারপর যখন সন্তান গায়ে গতরে বড়ো হয়, "নিঝুম" অর্থাৎ নিশ্চিন্ত জীবন থাকে না, জীবন মধ্যাণ্হে উপনীত হয়, কালের নিয়মে হয়তো বাবার হাত মাথা থেকে সরে যায়, তখন সংসার আবর্তে নাকানি চুবানি খেতে খেতে, সংসারজীবনের নানা ভূত যখন বিভিন্ন আপদের রূপ ধরে জীবনকে নাজেহাল করে তোলে, তখন বাবার অভাব অনুভূত হয় l
এই অভাববোধ, নিরাপত্তার অভাব ভয়ংকর রূপ নেয় l জীবনযন্ত্রণায় মন অস্থির হয়ে ওঠে l শৈশবের নিরুপদ্রব, নিরাপদ দিনগুলির কথা মনে পড়ে l  নিশ্চয়তা দানকারী বাবার কথা মনে পড়ে l ভালবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতায় বাবার উদ্দ্যেশে প্রণাম নিবেদিত হয় l
সন্তানের জীবনে পিতার ভূমিকা এই কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় l কিন্তু পিতার এই ভূমিকার উপলব্ধি সন্তান তখন পায় যখন সে নিজে পিতা হয়, নিজে সংসার এর কর্তা হয় l তখন সে বুঝতে পারে পিতা একটি সংসারের জন্য, সন্তান সন্ততির জন্য কতো গুরুত্বপূর্ণ l সংসারের দায়ভার নিয়ে পরিবারের কর্তা উদয়াস্ত যে পরিশ্রম করেন, সন্তান সন্ততির মঙ্গলের জন্য নিজে কষ্ট করেও, হাসিমুখে নিজের শেষ সামর্থ্যটুকু উজার করে দেন - শৈশবকালে সন্তানদের এই বোধ অনেকক্ষেত্রে জন্মায় না l এই বোধ তারা পায় পরে যখন নিজেরা বড়ো হয়, সংসার জীবন শুরু করে, নানা দায় দায়িত্ব পালন করে, যখন দেখে, নিজের জন্য নয়, আশ্রিতদের জন্য বাবারা বাঁচেন l বাবাদের নিজেদের সুখ, দুঃখ বলে কিছু থাকে না l সন্তানদের সুখের জন্য তাঁরা নিবেদিতপ্রাণ l
পিতৃত্বের অনুভব মানুষকে পিতা সম্পর্কটির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কৃতজ্ঞ, নতজানু করে l মনের ভেতরটা উদাস হয়ে যায় l পিতার প্রতি ভালোবাসার নতুন অনুভব জাগে l
নিজ পিতার প্রতি, হয়তো তিনি এখন আর জীবিত নেই, প্রণাম সমর্পিত হয় l
ছোট্ট কবিতা, প্রকাশভঙ্গি সুন্দর, বক্তব্য সরল l রূপক ব্যবহৃত হয়েছে l
কবির প্রতিক্রিয়া প্রার্থিত l


কবিতার পাঠোদ্ধারে আসরের কবিগণ যদি আলোচিত কবিতাটি সম্পর্কে তাদের মনোভাব প্রকাশ করে পাঠক-আলোচকদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন, তাহলে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে যে অভিযোগটা করা হয়, আধুনিক কবিতা নাকি দুর্বোধ্য, সংবাদপত্রের স্তম্ভের মতো কবিতার আকারে সাজানো কিছু অর্থহীন, ভাবহীন কথার সমষ্টি - এই জটটাই কেটে যাবে l আধুনিক কবিতা কিছু পাঠকের কাছে যদি তার অর্থ, তার আনন্দভাব তার নিজ অবয়বে মেলে ধরতে না পারে. সেক্ষেত্রে কিছু উৎসাহী পাঠক-আলোচক এবং কবি স্বয়ং যদি সেই কবিতার পাঠোদ্ধারে এগিয়ে আসেন, সে তো কবিতার পক্ষে ভালোই l এতে করে কবিতা পাঠকের সংখ্যা বাড়বে এবং কবিতা চর্চার পথ প্রশস্ত হবে l


কবিকে শুভেচ্ছা l