১২১
গতকাল ০৭-০৮-২০১৭ ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৭ তম প্রয়াণদিবস l কিন্তু কবিগুরুর মতো সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের প্রয়াণ হয় না l তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে l
যে কবিতাটি রচনার মধ্যে প্রথম কবিগুরুর অসাধারণ কবিত্বসম্ভাবনার আভাস পাওয়া যায়, সেই "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ" কবিতাটির ওপর আলোকপাত করে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই l
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির আভাসে ইঙ্গিতে তাঁর মধ্যে যে অসীম কবিপ্রতিভা রয়েছে, সেটা চিনতে পারছেন, অনুভব করতে পারছেন, তাঁর কবিপ্রতিভা বিকশিত হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছে, কবিতাটির মধ্যে তার পরিচয় পাই। ১৮৮২ সাল। রবীন্দ্রনাথের তখন ২১ বছর বয়স। কবিতা চর্চা চলছে। কিন্তু নিজের মধ্যে যে কাব্য সৃষ্টির এক প্রবল তাড়না অনুভব করা, সেটা তিনি এই মুহূর্তে পাচ্ছেন, যার অনুভব কবিতাটির ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। সদর স্ট্রিটের বাড়িতে থাকাকালে একদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। গাছের পাতার আড়াল থেকে সূর্যোদয় দেখা যাচ্ছে। সেদিকে চেয়ে আছেন যুবক কবি রবীন্দ্রনাথ। এই চেয়ে থাকতে থাকতেই রবীন্দ্রনাথ নিজের মধ্যে, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর যে সংযোগ, তার মধ্যে এক পরিবর্তন অনুভব করলেন। তাঁর মনে হল, মুহুর্তের মধ্যে যেন তাঁর চোখের ওপর থেকে একটা পর্দা সরে গেল। প্রকৃতিকে তিনি দেখছেন সেই নতুন দৃষ্টিতে। তিনি দেখলেন, এক অপরূপ মহিমায় বিশ্ব-সংসার সমাচ্ছন্ন। সকল স্থান আনন্দ এবং সৌন্দর্যে তরঙ্গিত। কবির হৃদয়ে পূর্ব থেকে স্তরে স্তরে বিষাদের একটা আচ্ছাদন ছিল। এক নিমেষে সেই আচ্ছাদন ভেদ করে কবির অন্তরমাঝে বিশ্বের সমস্ত আনন্দ ও সৌন্দর্যের আলোকবর্তীকা যেন বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ল। নির্ঝরের মতোই সেদিন "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ" কবিতাটি উৎসারিত হল কবির মনে। কবিতাটির রচনা সম্পূর্ণ হল। কিন্তু জগতের সেই আনন্দরূপ রবিকবির কাছে অনাবৃতই থাকল। পরবর্তী সকল সৃজনে প্রেরণার উৎস হয়ে।


বলা হয়, কবিতাচর্চায় সাধনা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন প্রেরণা। অতি অল্পবয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ কবিতা সাহিত্য চর্চা করে আসছিলেন। তাঁর সাধনার অভাব ছিল না। প্রয়োজন ছিল প্রেরণার। তাঁর নিজের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যাঁকে বলেছেন 'জীবনদেবতা'। নিজের ২১ বছর বয়সে ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ যেন প্রথম তাঁর জীবনদেবতার পরশ পাচ্ছেন। বিশ্বসংসার তার রূপ, রস, সৌরভের ডালি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সৃজনীশক্তিকে অনুপ্রাণিত করছে,
"না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।"
এবং
"কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ -
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারি দিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর -
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।"


এক মহৎ কবির যে জন্ম হতে চলেছে, বিশ্বসাহিত্য যে এক অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর কবি পেতে চলেছে, যে কবির রচনা একাধারে সাধনা ও প্রেরণার সৃষ্টি, তারই আভাস দেয় "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ" রচনাটি। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তাই এই কবিতাটি এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।
মূল কবিতাটি ইংরাজি ১৮৮২ (বাংলা ১২৮৯ সাল, অগ্রহায়ণ সংখ্যা) সালে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তার সংক্ষিপ্ত ও সম্পাদিত পাঠ দেয়া আছে।