৮২.
এই পৃথিবীর মধ্যে রয়েছে দুটো জগৎ l যাদের আছে সর্বস্ব, আর যারা নিঃস্ব l আপাত সুন্দর এই ধরণীতে কোথাও খাবারের প্রাচুর্য l কোথাও দু মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার l অসাম্য ও বৈষম্যের এই দুনিয়ায় কবিহৃদয় ব্যথিত l পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে কবির প্রার্থণা জগতে যাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান - জীবন ধারণের মূল যে চাহিদা তার সংস্থান নেই, তাদের দিকে তিনি যেন মুখ তুলে তাকান l করুণাময় ঈশ্বরের দয়া যেন তাদের প্রতি বর্ষিত হয় l তাদের তৃষিত হৃদয় ঈশ্বরের করুণা লাভ করে যেন বেঁচে ওঠে l

এমনিতে এই পৃথিবী বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর l তার সব সৃষ্টি দেখে মনে হয় কত কল্যাণকর l কিন্তু যা দেখা যায় তার সব সত্য নয় l এই ধরণীর মাঝে কতো  সহস্র মানুষ এমন আছেন যাঁরা দুবেলা ঠিকমতো খেতে পান না l অনাহারে, অর্ধাহারে রক্তে-মাংসে গড়া হাড়জর্জর শরীর নিয়ে তাঁরা শুধুমাত্র জীবন ধারণ করে আছেন l ক্ষুধার জ্বালায় রাতের পর রাত তাদের ঘুম হয় না l
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এইভাবে তাদের অনাহারে কাটাতে হয় সকাল দুপুর সন্ধ্যা l ধরিত্রী মা তাদের এই অসহায় অবস্থা নীরবে দেখে যান l তারও যেন কিছু করার থাকে না l
সভ্যতা এগিয়ে চলে l সভ্য মানুষদের মধ্যে এই অসহায় মানুষদের প্রতি করুণার ভাব আসে না l নিজেদের স্বার্থ নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে l যুগ বদল হয় l কিন্তু হতদরিদ্র মানুষেরা যে তিমিরে ছিলো সেই তিমিরেই থাকে l


কবি জানেন সময় অতিক্রম হলে একদিন সকল মানুষকেই খালি হাতে এক অবধারিত নির্দিষ্ট ঠিকানার উদ্দ্যেশে যেতে হবে l সেই গন্তব্য বিষয়ে আমাদের কতো উচ্চ মার্গের চিন্তাধারা l সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে আমাদের কতো অহংকার l কিন্তু মনুষ্যত্বের যে পরিচয়, তা আমরা রাখতে পারি না l একমুঠো খাবারের জন্য পথে পথে দরজায় দরজায় যারা ঘুরে বেড়ায়, পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত সেই অসহায় ক্ষুধাতুর মানুষদের ক্ষুধার অন্ন দিয়ে আমরা সাহায্য করি না l বরং তাদের উদ্যেশ্যে নিক্ষেপ করি অমানবিক বাক্য ও গঞ্জনা l
পরম কল্যাণময় ঈশ্বরের কাছে কবির বিনীত প্রার্থনা, তিনি যেন এই পাষণ্ড, নিষ্ঠুর, তথাকথিত সভ্য মানুষদের মধ্যে একটু করুণার সঞ্চার করেন, একটু দয়ার পাঠ দেন এবং এদের নিষ্ঠুরতার অন্ধকার দূর করে এদের মানব সেবায় প্রেরিত করেন l
ব্যক্তিগত জীবনে সফল এই মানবসমাজকে তাদের নিজস্ব স্বার্থসাধনের গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে জগতের কল্যাণে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য বিধাতার কাছে দরবার করেন কবি l


যে বিষয়টি নিয়ে কবিতাটি লেখা হয়েছে তার বাস্তবতা
যাচাই করতে গিয়ে দেখি ক্ষুধা আসলেই এক বিরাট সমস্যা l ক্ষুধার সমস্যা বেশী আছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে l
পরিসংখ্যানে পাই,
১) বর্তমানে পৃথিবীর মোট প্রায় ৭১০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১২ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ ৮৪.২ কোটি মানুষ অনাহারের শিকার l
২) এই সংখ্যার ৯৮ শতাংশ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে l ৫৫.৩ কোটি মানুষ এশিয়া এবং Pacific অঞ্চল থেকে l ২২.৭ কোটি মানুষ Sub-Saharan Africa থেকে l ৪.৭ কোটি মানুষ লাতিন আমেরিকা ও Caribbean অঞ্চল থেকে l
৩) দেশ হিসাবে ভারতে অভুক্ত লোকের সংখ্যা সবথেকে বেশী l ২০১৪ সালে ভারতে এই সংখ্যা ছিলো প্রায় ১৯ কোটি l
৪) প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ অনাহারেই মারা যায় l এই সংখ্যা malaria, AIDs এবং tuberculosis অসুখ মিলে মোট যতজন মারা যায়, তার থেকেও বেশী l
৫ ) বিশ্ব জুড়ে প্রতি বছর অনাহারের কারণে যারা মারা যায়, তাদের ৬০ শতাংশ মহিলা l পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকেই এর জন্য দায়ী করা হয় l
৬) মহিলাদের মধ্যে অপুষ্টি অধিকমাত্রায় থাকার কারণে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রেও অপুষ্টি একটি প্রধান কারণ l
৭) প্রতি বছর গড়ে ৩১ লক্ষ শিশু ক্ষুধার কারণে মারা যায় যা বিভিন্ন কারনে মোট শিশুমৃত্যুর ৪৫ শতাংশ l
৮) অনাহারের প্রধানতম লক্ষণ অপুষ্টি l বর্তমানে বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের ৪০ শতাংশ রক্তাল্পতার  শিকার l শিশুর জন্মকালীন মায়ের মৃত্যুর ২০ শতাংশ রক্তাল্পতার কারনে হয় l এছাড়াও বিশ্বে প্রায় তিন থেকে পাঁচ লক্ষ শিশু প্রতি বছর দৃষ্টিশক্তি হারায় শুধু ভিটামিন এ -র ঘাটতির জন্য l
বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূরীকরণে প্রচেষ্টা চলছে l কিছুটা উন্নতি হয়েছে l এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে l USAID, UNICEF প্রভৃতি সংস্থা কাজ করে চলেছে l অনেক অনেক মানুষের সহযোগ প্রয়োজন l  
(সংগৃহীত - Chasen Turk)
উল্লিখিত তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কবি এম,এ,মতিন-এর "ক্ষুধার্ত" কবিতাটি বড়ো বেশী প্রাসঙ্গিক মনে হয় l
কবিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা এরকম একটি মানবিক বিষয়ে কবিতা রচনা করবার জন্য l