৭১. কবিতার নাম : জননীর ব্যথা
       কবি : অজিত কুমার কর


আলোচনা :
কথায় বলে ভালোবাসা নিম্ন অনুসারী l অর্থাৎ ভালোবাসা পরের প্রজন্মের দিকে ছোটে l মা তাঁর সন্তানকে ভালোবাসেন l সেই সন্তান ভালোবাসেন তাঁর সন্তানকে l এখানে কোথাও ভালোবাসার অভাব নেই l শুধু আছে সেই ভালোবাসার অভিমুখ নির্বাচনের বিষয় l
পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না l বলা হয় মাতৃঋণ অপরিশোধ্য l কিন্তু মায়ের প্রতি কর্তব্য করা যায় l
শিশু যখন ছোট থাকে, মা তার প্রতি যে কর্তব্য করেন, ভালোবাসার আকর্ষণে করেন l শিশুরা এমনিতেই সরল, নিষ্পাপ l তার দৃষ্টিতে যে কোনো কঠিন হৃদয় বিগলিত হয় l আর যিনি মা, যিনি সেই শিশুর জন্মদাতা, তিনি যে সেই শিশুর দর্শনে কি আত্মপ্রসাদ লাভ করেন, সেটা সহজেই অনুমেয় l সেই শিশুর দেখাশোনা, তার পরিচর্যা, তার বেড়ে ওঠার প্রতি মুহূর্তে যখন যা প্রয়োজন তার আয়োজন করা - প্রতিটি মায়ের কাছে তাঁর জীবনের বিরলতম আনন্দ অভিজ্ঞতার অনুভব নিয়ে আসে l যাঁরা মনে করেন শিশু পালন করতে গিয়ে মা অনেক কষ্ট করেন, তাদের এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই l এখানে কষ্টের অনুভব থেকে সুখানুভূতির অনুভব অনেক অনেক গুণ বেশী সক্রিয় থাকে l এর প্রমাণ পাওয়া যায় কোনো মা যখন সন্তানের জন্ম দিয়েও কোনো কারনে সেই সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হন - তাঁর অনুভব থেকে l মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের মাতা দেবকীর এই দুর্ভাগ্য হয়েছিল l
যেভাবেই হোক, যত পরিশ্রম করেই হোক, একজন মা সর্বদা তাঁর সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্খী l "জননীর ব্যথা" কবিতায়  কবি অজিত কুমার কর সঠিকভাবেই বলেছেন,
"সদা শশব্যস্ত মাতা সন্তানের হিতে"


মা চিরদিন যুবতী থাকেন না l সন্তান বড়ো হতে হতে মায়েরও বয়স বাড়ে l শরীর দূর্বল হয় l চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয় l সেই সময় সন্তান সেই মায়ের দায়িত্ব নেবেন এটাই কাঙ্খিত l সমাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরকমটাই হয়ে থাকে l মাতৃপ্রেমের বহু বহু উদাহরণ চারপাশে দেখা যায় l নিজ নিজ পরিবেশে প্রায় প্রতিটি পরিবারে দেখি সন্তানেরা যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়ে বৃদ্ধা মায়ের সেবা করছেন l
বিরল কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানেরা বৃদ্ধা, দূর্বল, অস্থিচর্মসার, মায়েদের প্রতি কর্তব্য করেন না l এরকম সন্তানদের বোধোদয়ের জন্য, তাদের কর্তব্যের পাঠ দেবার জন্য "জননীর ব্যথা" কবিতাটি এক উৎকৃষ্টতম রচনা l প্রতিষ্ঠিত সন্তান যদি অসহায় মায়ের দায়িত্ব না নেন, দেবতার ভরসায় নিজ মা-কে ছেড়ে দেন, তাহলে সেই মায়ের কি অবস্থা হয় ! তাঁর সহায় তো তাঁর সন্তান l সেই সন্তান মুখ ফিরিয়ে নিলে এই পৃথিবীতে নিজ ব্যথা নিয়ে কোথায় যাবেন তিনি ? বনের পশুপাখি, তৃণলতা - তারা সেই মায়ের দুঃখ বোঝে l বোঝে না নিজ জঠরজাত সন্তান l এটা মাতৃত্বেরও অপমান l মা এই অপমানের কথা কাউকে বলতে পারেন না l নীরবে সব সহ্য করে দিনানিপাত করেন l নিজ সন্তানের বিরুদ্ধে একটি কথা তাঁর মুখে আসে না l মুখ বুজে, উদাস চোখে, ভারাক্রান্ত দেহে অনাহার, অসুখ, অনটন, অবহেলা সহ্য করে দেবতার কাছে অনুনয় জানান l
যার স্তনদুগ্ধ পান করে সন্তান বড়ো হয়, যার রক্ত সন্তানের শরীরের শিরায় উপশিরায় সদা প্রবাহিত, সেই মা, বর্তমানে বৃদ্ধা, অনাহারে শীর্ণা, রোগাক্রান্তা - তাঁর চোখের জল সন্তান মুছে দিবে না ?
অকৃতজ্ঞ সন্তানের এই দুরাচার দেখে বিধাতা নীরব কেন ? পরপারে এই মাতৃদ্রোহী সন্তানেরা কোথায় স্থান পাবেন - স্বর্গে, নাকি নরকে ? কবির প্রশ্ন বিধাতার কাছে l
মাতৃজাতিকে নিয়ে অসাধারণ সুন্দর একটি কবিতা l গঠনগত দিক থেকে সনেট কবিতা l ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবিতাটিকে ঠিক আধুনিক বলা যায় কি না, সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে,  তবু বিষয়নৈপুণ্যে ও বার্তা বহনের প্রশ্নে কবিকে অভিনন্দন জানাতেই হয় l
কবিকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন l