৯৯.
কবি তুহিন আহমেদের আজকের (০৯-০৭-২০১৭) প্রোফাইল দেখলাম l ৩৭ বছর বয়সের এই কবি ৮ মাস হলো আসরে আছেন l ৫০ টি কবিতা পোষ্ট করেছেন l কবিতার বিষয়গুলি বৈচিত্র্যপূর্ণ l প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, সমাজব্যবস্থা, ভক্তিরস প্রভৃতি নানা বিষয় কবিতাগুলিতে স্থান পেয়েছে l প্রথম দিকে লেখা "নদীর দুঃখ" কবিতাটি চমৎকার l
আজকের আলোচ্য কবিতা "বাবা দিবসে হতভাগ্য বাবার মিনতি" l কবি আসরে কবিতাটি পোষ্ট করেছেন ১৯-০৬-২০১৭ তারিখ l প্রতি বছর পৃথিবী জুড়ে বাবা দিবস পালিত হয় জুন মাসের তৃতীয় রবিবার l এবছর সেই দিনটি পড়েছিল ১৮ জুন তারিখে l অর্থাৎ কবি তুহিন আহমেদ আসরে কবিতাটি পোষ্ট করেছিলেন বাবা দিবসের পরের দিন l


কবিতাটিতে এক বাবার মনোবেদনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে l শিশু যখন ছোটো থাকে তখন সে পুরোপুরি মা ও বাবার ওপর নির্ভরশীল l শিশুর জন্ম ও বিকাশে মায়ের ভূমিকার কোনো তুলনা হয় না l কিন্তু আলোচ্য  কবিতাটিতে যেহেতু শুধু বাবার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে, তাই আলোচনাতেও শুধু বাবার প্রসঙ্গটিই আসবে l শিশুকালে সন্তানকে হাসিখুশি রাখার জন্য বাবা কত কিছুই না করেন ! ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করে, সুরে বেসুরে গান করে, গল্প বলে শিশুর রাগ অভিমান দূর করেন l নিজে ঘোড়া সেজে শিশুকে পিঠে নিয়ে তাকে রাজ অনুভব দান করেছেন l আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়েছে সন্তান l কখনো শিশুকে কাঁধে নিয়েছেন l অবোধ শিশু অবলম্বন হিসেবে বাবার কান চেপে ধরেছে l যেন বাবার কান মলে দিচ্ছে এবং কোন্ দিকে যেতে হবে তার নির্দেশ দিচ্ছে l এই স্বেচ্ছা পরিশ্রম বাবার কাছে যে কতো আনন্দ, কতো উচ্ছ্বাস এর উৎস, তা একজন বাবাই উপলব্ধি করতে পারেন l
তারপর সন্তান বড়ো হয় l জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় l হয়তো দেশে বিদেশে অনেক সম্মান প্রতিপত্তি হয় তার l সভা সম্মেলনে সদা ব্যস্ত থাকে l তার নিজের সংসার হয় l তার প্রতি দায় দায়িত্ব থাকে l এত সব কিছুর মধ্যে সেই সন্তানের কাছে নিজের বাবার জন্য কোনো পরিসর থাকে না l বাবার স্থান হয় কোনো বৃদ্ধাশ্রমে l ব্যস্ত জীবনমাঝে সেই বৃদ্ধাশ্রমে বাবার সঙ্গে দেখা করবার জন্য সময় পায় না সেই উচ্চ প্রতিষ্ঠিত সন্তান l বাবাকে একবার বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার পর আর সে পথ মাড়ায় না সন্তান l বাবার সঙ্গে আর তার কোনো প্রয়োজনই থাকে না l সন্তানের এই অবহেলা, এই অনাদর পিতৃ হৃদয় মেনে নিতে পারে না l ছেলেকে ঘিরে, তার শৈশব ঘিরে, তার বেড়ে ওঠার দিনগুলিকে ঘিরে অনেক অনেক স্মৃতি বৃদ্ধাশ্রমে বন্দী বাবার মনে ভেসে ওঠে l ছেলেকে এক ঝলক দেখার জন্য তাঁর মন ছট্পট করে l তাই ফেসবুকের শরণ নেন নিরুপায় বাবা l পাছে তাঁর নাম দেখলে সন্তান তাঁকে block করে দেয়, এই আশঙ্কায় ছদ্মনামে ফ়েসবুক -এ ছেলের সঙ্গে frindship করেন তিনি l ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে তার friend circle এ থাকেন তিনি l ছেলে কখন কোথায় যায়, কি করে - সব খবর তিনি facebook থেকে live পেয়ে যান l তাঁর মনে হয় সন্তান যেন সঙ্গেই আছে l আসলে তো সঙ্গে নেই ! এটা তিনিও জানেন l সবই বোঝেন l তবু মিথ্যাই মনকে প্রবোধ দেন l সামনে যে অন্তত দেখতে পাচ্ছেন, এতেই মনকে তুষ্টি দেন l
সন্তানের ছোট্ট সংসারে একটুকু ঠাঁই পাবার জন্য বাবার মন ব্যাকুল হয় l এমনকি কাজের লোক হিসাবে প্রবেশ পেতেও তাঁর আপত্তি নেই l একজন কাজের লোককে ছুটি দিয়ে তাঁকে সেই জায়গায় রাখা হোক এই মিনতি করার সাধ জাগে বাবার মধ্যে l অভিমানী বাবা ভাবেন, টাকা পয়সার কাজে সন্তান যদি তাঁকে বিশ্বাস না করে,  তিনি বরং অন্য কাজ করবেন, বাগানের পরিচর্যা করবেন, মালী পরিচয়েই না হয় থাকবেন l এর জন্য কোনো অবমাননা বোধকে তিনি গ্রাহ্য করবেন না l
তিনি শুধু তাঁর সন্তান, তাঁর সন্তানের পরিবারের সংস্পর্শে থাকতে চান l কিন্তু সেটা সম্ভব হয় নি বলে পুত্র বাৎসল্যে অন্ধ পিতা সন্তানকে নয়, নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করেন l শুধু তাঁর অন্তরের কামনা, এত বঞ্চনা, অপমান, প্রত্যাখ্যান এর মধ্যেও সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম facebook অ্যাকাউন্ট টি যেন সক্রিয় থাকে, তাঁর সন্তান কোনভাবে খোঁজ পেয়ে তাঁর অ্যাকাউন্ট টিকে যেন block করে না দেয় l
সারা পৃথিবী জুড়ে বাবা দিবস পালিত হলো l facebook এ বাবাদের সম্মানে কতো সুন্দর সুন্দর পোষ্ট চোখে পড়ল l তা দেখে সব বাবারই গর্ব হয় l সারাটি দিন ধরে এই হতভাগ্য বাবাটি সন্তানের অপেক্ষায় রইলেন l মনে ক্ষীণ আশা, অন্তত আজকের দিনে সন্তান দেখা করতে আসবে l কিন্তু আজকের এই বাবা দিবসেও সেই সন্তানের বাবার সঙ্গে দেখা করার সময়টুকু হলো না !


ভালবাসার ধর্ম হলো তা পূর্ববর্তী প্রজন্মের দিকে নয়, পরবর্তী প্রজন্মের দিকে প্রবাহিত হয় l এই সন্তানটিও পিতার প্রতি তার কর্তব্যে অবহেলা করলেও, নিজের খোকার প্রতি পিতার কর্তব্য পালনে তার কোনো খামতি থাকে না l fecebook এ দেখা যায় নিজ খোকার সঙ্গে তার ক্রীড়ারত হাস্যমুখ এবং পিতৃসুখের অনুভবের চিত্র  l বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানকারী অসহায় দুঃখী পিতা তাঁর মানসনেত্রে দেখতে পান তাঁর নাতি বড়ো হয়েছে l তাঁর কামনা, তাঁর পৌত্র যেন তাঁর সন্তানের থেকেও অনেক অনেক বেশী প্রতিষ্ঠা পায় l কিন্তু তাঁর প্রার্থনা, সে যেন তার বাবাকে ভুলে না যায় l বৃদ্ধ পিতা তাঁর সন্তানকে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে আশীর্বাদ করেন তার ভাগ্য যেন তার অসহায় পিতার মতো না হয় l তার সন্তান যেন বৃদ্ধ বয়সে তার দেখাশোনা করে l


এটা একটা রহস্য l একই মানবসন্তান, পিতার কর্তব্য যখন নিখুঁতভাবে, দায়িত্বের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে পালন করছে, সন্তানের কর্তব্য পালন করার সময় সে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে l এর কারণ কি ? এর জন্য বৃদ্ধের লোলচর্ম চেহারা আর শিশুর নিষ্পাপ কোমল চেহারার মধ্যে আকর্ষণীয়তার যে অন্তর - সেটাই কি কারণ ? শিশুর পরিচর্যা করা, তার সঙ্গে খেলাধুলা করা - এর মধ্যে এক পিতা যে আনন্দ পান, বৃদ্ধ পিতার পরিচর্যা করতে সন্তান সেই আনন্দ পান না, এটাই কি কারণ ? এজন্যই কি বাবাদের এই অনাদর ? এই কারণেই কি আজ বৃদ্ধাশ্রমের এত বৃদ্ধি ? বৃদ্ধ পিতামাতাকে অবহেলার এটাই কি মূল কারণ ?


বিশ্ব জুড়ে বাবা দিবস পালনের মুহূর্তে এই ভাবনাগুলি তাই খুবই প্রাসঙ্গিক l প্রতি বৎসর বিভিন্ন দিনে বিশ্বব্যাপী নানা দিবস পালিত হয়। এই সকল দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে - কোন একটি নির্দিষ্ট দিনে সাম্প্রতিককালের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি বা কোন অতীত ঘটনা স্মরণ বা উদযাপন করা।


যে কোনো পরিবারে বাবা এক বটবৃক্ষের মতো l যে কোনো প্রয়োজনে, বিপদে আপদে বাবা এক বিরাট সহায় l শত-সহস্র ঝড়-ঝঞ্ঝা নীরবে সহ্য করেন, কিন্তু সন্তানদের অতি ক্ষুদ্র আঘাত কিংবা কষ্টের ছিটেফোঁটা লাগাতেও নারাজ । নিজের অনেক  সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে বাবা তার সন্তানদের ভালো রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন । নিজের শরীর আবৃত কিনা সেদিকে খেয়াল নেই। কিন্তু সন্তানের শরীর উন্নত ও দামি পোশাকে মুড়িয়ে রাখতে সদা ব্যস্ত । নিজে অভুক্ত থেকে সকল খাদ্য ছেলে-মেয়ের পাতে তুলে দিতে এতটুকু কার্পণ্য দেখান না - তিনিই-বাবা l সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত তৈরি করতে যিনি সারাদিন খেটে যান তিনিই বাবা । নিজে ত্যাগের দর্শন গ্রহণ করে সন্তানকে ভোগের নিশ্চয়তা দিতে সদা বদ্ধপরিকর যিনি, তিনিই বাবা ।


তারই স্বীকৃতিতে বছরের এই একটি দিন  সন্তানেরা বা সন্তানতুল্য ব্যক্তিরা আলাদা করে বেছে নিয়েছেন বাবা দিবস হিসাবে l সারা বিশ্বের সন্তানরা পালন করে এই দিবস।
"কাটে না সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না
জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা
মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না
আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়…।"
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া এই গানটি সন্তানদের এক অসীম নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে দেয়।
বাবার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর জন্য এই দিবস। যদিও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার প্রকাশ প্রতিদিনই ঘটে। তার পরও পৃথিবীর মানুষ বছরের একটা দিনকে বাবার জন্য রেখে দিতে চায় l

প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। জানা যায়, ১৯০৮ সালে প্রথম বাবা দিবস পালনের  উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টে ৫ জুলাই এই দিবস পালন করা হয়েছিল। জনৈক মিসেস গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটনের উদ্যোগে এই দিবসটি পালিত হয়। ১৯১৩ সালে আমেরিকার সংসদে বাবা দিবসে ছুটি ঘোষণার জন্য একটি বিল উত্থাপন করা হয়। ১৯২৪ সালে সে সময় আমেরিকার প্রেসিৃেডন্ট ক্যালভিন কুলিজ বিলটিতে পূর্ণ সমর্থন দেন। পরে ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বাবা দিবসে ছুটি ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রতিবছর জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের রীতি চালু করেন।


বাবা দিবস উপলক্ষ্যে এরকম হৃদয় বিদারী একটি কবিতার মাধ্যমে কবি তুহিন আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার সামাজিক দায় পালনের সাক্ষ্য রেখেছেন l
কবিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই l