১০১.
নাজমুন নাহার রচিত "রক্তের হোলিখেলা" কবিতাটি এক পরিবারের পটভূমিতে শুরু হয়ে বৃহত্তর সামাজিক পটভূমিকায় স্থাপিত l যে কোনো সম্পর্ক স্থাপন ও স্থায়িত্বের জন্য প্রেম ভালবাসা, আলাপচারিতা ও সম্প্রীতির আবহের গুরুত্ব যে অসীম, কবিতায় সে কথা বলার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় l


দুর্ঘটনা নিমন্ত্রণ পেয়ে আসে না l যে কোনো সময়ে ঘটতে পারে l পরিবারিক জীবনে ছোটখাটো হিংসার ঘটনাও ঘটে l আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ হয় l ছোটখাটো আঘাত, রক্তপাতের ঘটনাও ঘটে যায় l ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত l যেমন কবিতার শুরুতে দেখলাম একজনের আঙ্গুল কেটে গেছে l এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে ? কবি দুটি বিকল্পের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং প্রতিটি বিকল্পের কি পরিণতি হতে পারে তার রূপচিত্র এঁকেছেন l


প্রথম বিকল্পটি হল, প্রেম ভালবাসার পথ l যে ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটার নিরাময়ের জন্য ভালবাসাকে সম্বল করে পরস্পরের কাছে আসা, ভুল স্বীকার করে অপরজনের ব্যথা নিরসন করার প্রয়াস করা এবং সম্প্রীতির আবহে সম্পর্ককে পুনঃস্থাপন করা l প্রিয়তমকে মিনতি করা হল সেই ক্ষতে জিভ রেখে তার ব্যথা নিরসনের জন্য l


দ্বিতীয় বিকল্প হলো, লড়াই সংগ্রামের পথে গিয়ে সম্পর্কের আরও অবনতি করে অধিকতর রক্তপাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া l পরেরদিন অনেক অনেক রক্তপাত হবে l রক্তের নদী (তিতাস) বয়ে যাবে l সেই নদীতে ঘামে ভেজা দেহ অর্থাৎ রাগে উত্তেজনায় পূর্ণ দেহ অবগাহন করে মনের সুখ মেটানো হবে l  
এই অনেক রক্তপাত, রক্তের এই হোলিখেলা বড়ো ধরনের গোলমালের ইঙ্গিতবাহী l সম্পর্কে পচন ধরে এবং শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায় দুর্ভাগ্যজনক বিচ্ছেদে l


আঙ্গুল দেহের অঙ্গ, মানুষের শক্তির আধার l পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রেমভালবাসার সম্পর্ক স্থায়ী সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয় l তেমনই সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সম্প্রীতি একটি জাতির শক্তির আধার l আঙ্গুল কেটে গেলে যেমন রক্তপাত হয়. যন্ত্রণা হয়, সেই কাটা স্থানে যদি উপযুক্ত পরিচর্যা না হয়, প্রেমের পরশ না দেয়া হয়, হিংসার আবহে ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বেড়ে যেতে থাকে, তাহলে সেই ক্ষতস্থানে infection হতে পারে, পচন ধরতে পারে l গ্যাংরিন হতে পারে l তখন আঙ্গুল কেটে বাদ দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না l দেহের এক অত্যন্ত উপযোগী অঙ্গ দেহ থেকে বাদ যায়, যা পরিবারের বিচ্ছেদের রূপক l ঠিক তেমনই, দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতির সম্পর্কে যদি ফাটল ধরে, সেখান থেকে সামান্য রক্তপাতও যদি হয়, উপযুক্ত পরিচর্যা না হলে, পারস্পরিক প্রেম ভালোবাসার পরশ দিয়ে সেই ক্ষতের সময়মতো নিরাময় করে না নিলে, সেই সামান্য ক্ষত বাড়তে বাড়তে এমন স্তরে পৌঁছয়, যখন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অনেক অনেক মানুষের জীবনহানির ঘটনা, সেই জাতিকে দূর্বল করে l একটি সম্প্রদায় অন্য একটি সম্প্রদায়ের রক্তের পিপাসু হয়ে ওঠে l হিংসার বাতাবরণে মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয় l রক্তের নদী বইয়ে দেবার শপথ নেয়া হয়  উভয়পক্ষেই l উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজনের মৃত্যু যেন সেই জাতির অঙ্গচ্ছেদ ঘটায় l মানুষের রক্তের নদী (যমুনা) বয়ে যায় l জীবনহানির এই সংগ্রামে, শক্তির পঞ্চকলা প্রদর্শনের এই নারকীয় যজ্ঞে বারংবার জাতি দূর্বল হয় l


তাই কবি আহ্বান করেন, দুই প্রিয় যেমন পরস্পরের ক্ষত নিবারণে প্রেম ভালবাসার পুঁজি নিয়ে এগিয়ে আসেন, তেমনই দুটি সম্প্রদায় ভালবাসা ও সম্প্রীতিকে সম্বল করে পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসুক, ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি আলোচনা বাক্যালাপের মধ্যে দূর হয়ে যাক - তবেই একটি জাতি প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে l
পরস্পরকে সংহার করার মানসিকতা ত্যাগ করে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতির হাত বাড়িয়ে দেবার আহ্বান সূচক বার্তা রেখে কবি নাজমুন নাহার এই কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছেন l
কবিকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন l