৪৯. কবিতার নাম -বিধি যখন চোখ দিয়েছ
কবির নাম - স্বপন কুমার মজুমদার

আলোচনা -
লক্ষ কোটি জীবন প্রজাতির মধ্যে মানবজন্ম অনন্য l একমাত্র মানুষ পেয়েছে জাগতিক পঞ্চ ইন্দ্রিয় l প্রকৃতিকে বুঝে নেবার ক্ষেত্রে এই ইন্দ্রিয়গুলি তার বড়ো সহায় l কোন কোন মানুষের ক্ষেত্রে এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় এত বেশী গ্রহণক্ষম এবং উৎপাদনক্ষম যে জীবনযাপনের দৈনিক বাধ্যবাধকতা পেরিয়ে তাঁরা অনুভব করেন অতিজাগতিক কিছু বিষয় l তাঁদের সংবেদনশীল, ভাবুক মন পৃথিবীতে জীবনের রহস্য উন্মোচনে নানা সৃজনশীল চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে l সাধক মন এই জগৎ, জীবন সবকিছুর পেছনে এক অলৌকিক সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে, ঈশ্বররুপী পিতার ভাবনায় ভাবিত হয় তার চিন্তা, চেতনা l সেই পরম পিতাকে উদ্দেশ্য করে রচিত হয় কত মন্ত্র, শ্লোক, সঙ্গীত, নানা গাথা l গড়ে ওঠে কতো বিধি, ব্যবস্থা, আচরণ, সংস্কার, আয়োজন সামগ্রী l কতো বিচিত্র মত ও পথ l জীবন যাপনের অনুষঙ্গ হয় এই আধ্যাত্মিক ভাবনা l
জন্ম, বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু বরণ - এর সীমা ছাড়িয়ে মানব জীবন নিয়োজিত হয় জীবনের গভীর রহস্য উন্মোচনে যেখানে এই সৃষ্টির পেছনে সে অনুভব করে এক পরমপিতা ঈশ্বরের উপস্থিতি l এই ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা, নিজের জীবনে সন্তানসম ভক্তি ও কৃতজ্ঞতায় তাঁকে অনুভব করা - আদর্শ জীবনযাপনের অনুসঙ্গ রূপে বিবেচিত হয় l
কিন্তু সব মানুষ তাঁর জীবনে এই বোধ পান না l জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত কিছু মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপে এতটাই জড়িয়ে পড়েন, যে অন্য সকলে তাঁদের অস্তিত্বের মধ্যে পরমপিতা ঈশ্বরকে অনুভব করলেও, তাঁরা সেটা পান না l ঈশ্বরের দেয়া এই অমূল্য জীবন, এই ইন্দ্রিয়সকল ঈশ্বরের অনুভব পায় না l


"বিধি যখন চোখ দিয়েছে" কবিতায় কবি স্বপন মজুমদার এরকম এক প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন যেখানে একজন মানুষ তাঁর অনুভবে ঈশ্বরকে, পরমপিতাকে পাচ্ছেন না l বিধাতার দেওয়া চোখ সেই বিধাতাকেই দেখতে পায় না l দৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার দিকে নিবদ্ধ নয় l হৃদয় তাঁর ভাবনায় ভাবিত নয় l পথ ঈশ্বরমুখী নয় l তাঁর কান ঈশ্বরের আগমণধ্বনি শুনতে পায় না l জীবনযন্ত্রণায় বিদ্ধ এই মানব ঈশ্বর কল্পনার রঙীন জাল বুনতে পারে না, পথে আল্পনা এঁকে পরমপিতাকে আহ্বান করতে পারে না l
চোখ, কান - এগুলি তো দৃশ্য ইন্দ্রিয় l কিন্তু তার থেকে অনেক শক্তিশালী অনুভব ইন্দ্রিয় হলো আমাদের মন l সেই মনে কতো ভাব জমে l কতো অনুরণন চলে l এই মনের ভাবনাতেই যুগে যুগে ঈশ্বর কতো নতুন নতুন মাত্রা পান l কতো বিচিত্র বিশ্বাসবোধ মনের আঙিনায় জন্ম নেয় পরমপিতাকে ঘিরে l
কোনো মানুষের এই মন যদি ঈশ্বর ভাবনায় ভাবিত না হয়, তাঁর প্রেমে উদ্বেল না হয়, তাহলে তাঁর মানবজন্মটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে l এরকমই এক মানুষকে চিত্রিত করা হয়েছে কবিতাটিতে, যিনি জীবনে অন্য সব কিছু করার সময় তো পান, কিন্তু তাঁর স্পর্শেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, মনের বিচরণ কিছুই তাঁকে সেই পরমপিতার কাছে নিয়ে যায় না l পার্থিব সমস্ত কিছুর সঙ্গেই তাঁর পরিচয় হয়, সম্পর্ক স্থাপিত হয় l কিন্তু যিনি পিতা, এই বিশ্ব ব্রম্ভান্ডের রচয়িতা, জীবনের উদ্গাতা - তাঁর দিকে তার দৃষ্টি যায় না l
কবিতাটিতে এরকম এক মানুষকে তুলে ধরা হয়েছে যিনি মানবজীবনকে তার চরম সার্থকতার পথে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন l তাঁর ব্যর্থতার এই অনুভব, তাঁর স্বীকারোক্তি, অনেক পথভোলা, মনভোলা মানুষকে পথের সন্ধান পেতে সাহায্য করবে l
আধ্যাত্মিক ভাবনায় পূর্ণ এরকম একটি সুন্দর কবিতার জন্য কবিকে অভিনন্দন l