স্কুলপাঠ্য ভাষাশিক্ষার বই-এ দুটি ভাগ দেখি - পদ্যাংশ ও গদ্যাংশ l প্রথম ভাগে ছড়া, পদ্য ও কবিতা সবই সন্নিবেশিত হয় l ছড়া, পদ্য ও কবিতার মধ্যে সম্পর্ক খুব নিবিড় l বলা হয় সব ছড়াই পদ্য কিন্তু সব পদ্যই ছড়া নয় l তেমনই সব কবিতাই পদ্য কিন্তু সব পদ্যই কবিতা নয় l ছড়া, পদ্য ও কবিতা সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন l বিস্তৃত সংজ্ঞায় না গিয়ে সহজ কথায় এগুলির বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোকপাত করব l ছড়া বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল শাখা l ছেলেভুলানো পদ্য হিসাবে এর জন্ম l ছড়ায় ছন্দ ও অন্ত্যমিলের দ্বারা চটুল শব্দের সহযোগে যে কোনো বিষয়কে মজাদার ও রসাত্মক করে তোলা হয় l ছড়ায় থাকে হালকা বা চটুল চাল এবং তা পড়তে হয় দ্রুততালে l ছড়ার ক্ষেত্রে আর একটি কথা বলা প্রয়োজন, এখানে অর্থ প্রকাশের ব্যাপারটিও জরুরী নয় l শুধুমাত্র অন্ত্যমিল আছে, ছন্দ আছে, কিন্তু ব্যবহৃত পদসমষ্টির কোনো অর্থ হয় না, ছড়ার ক্ষেত্রে এটা হতে পারে - ইংরাজি ভাষায় এই ধরনের ছড়াকে non-sense poetry বলা হয় l প্রথম ছড়া "পট্ কার ছট্ কা "  (স্বরচিত) এই শ্রেণীভুক্ত l
আর পদ্যের ক্ষেত্রে বলা যায় এখানেও ছন্দ ও অন্ত্যমিলের অনুশাসন থাকে, তবে পদ্য পড়তে বা আবৃত্তি করতে হয় ধীর লয়ে l সহজ সরল ভাব সোজাসুজি এখানে প্রকাশ করা হয় l কবিতার মতো বিমূর্ততা বা রূপকতার অবকাশ পদ্যে নেই l এখানে সহজভাবে কবির ভাবনা প্রকাশ পায় এবং পাঠকের ভাবনার সাথে তা মিলেও যায় l পদ্যের বক্তব্যের মধ্যে কোনো রাখঢাক থাকে না, যা কবিতায় থাকে l
কবিতার ক্ষেত্রে বলা যায়, বর্তমানে কবিতায় অন্ত্যমিল বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু ছন্দের অনুশাসন কবিতার ক্ষেত্রেও মেনে চলতে হয় l ছন্দের উপস্থিতি প্রয়োজন কবিতার সর্বাঙ্গে l কবিতায় ছন্দের অভাব থাকলে সেই রচনা পাঠ করা বা আবৃত্তি করা যায় না,  অর্থাৎ সেই রচনা কবিতা হয়ে ওঠে না l কবিতায় প্রকাশিত ভাবে রাখঢাক থাকে l কবির ভাবের সঙ্গে পাঠকের ভাব নাও মিলতে পারে l কবি তার অবস্থান থেকে যা বলেছেন, পাঠক তার ভিন্ন পটভূমি থেকে সেই কবিতার ভিন্ন ভাব অনুধাবন করতে পারেন l কবিতায় উপমা, রূপক, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারাদি ব্যবহার করা হয়, কথার মধ্যে ব্যঞ্জনা থাকে,  যার ফলে কবিতায় প্রকাশিত ভাব সর্বক্ষেত্রে পদ্যে প্রকাশিত ভাবের মতো অত সহজ, সরল, সোজাসাপ্টা হয় না l এই হল কবিতা সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা l
স্বরচিত কিছু ছড়া, পদ্য ও কবিতা উদাহরণ রূপে রাখলাম l


ছড়া : ১) পট্ কার ছট্ কা (Nonsense Rhyme )


এ্যাই শোন পট্ কা
লাগে বড়ো খট্ কা
কে যে বলে হাম্ ডি
কি করে যে দাম দি I


দাম টাম নিতাসে
কাম টাম কোথা সে
ও কথাটা মানি না
আনি মানি জানি না l


ছড়া : ২) আমতলা


আম পাতা ঝর ঝর
যায় পড়ে পর পর
আসে শীত কন্ কন্
ছোটে মন হন্ হন্ l
শালিখের হুটোপুটি
গাছতলে আসে জুটি
দেয়ালের কোণেতে
লেগে যায় রণেতে l
জমা পাতা ছারখার
ইস্ পার উস্ পার
কিচ্ মিচ্ ধুপ্ ধাপ্
থেকে থেকে চুপচাপ l
ভয়ভরা চাহনি
চঞ্চল বাহিনী
গায়ে গায়ে ধাক্কা
পাতা-ক্রীড়া পাক্কা l
গাছতল দৃশ্য
পাখি গুরু শিষ্য
মজা করে এন্তার
সুখে কাটে দিন তার l
প্রকৃতির কোলেতে
পাখি ছেলেপুলেতে
জমে ওঠে সংসার
অবসান হিংসার l


পদ্য : ১) পথ সারমেয়


রাত্রিবেলা চোর না ধরে দিনের বেলা ঘেউ ঘেউ,
যখন তখন লড়াই চলে হেরে গেলেই কেঁউ কেঁউ l
রাস্তা গুলো নোংরা করিস বর্জ্য যত্র তত্র
স্বচ্ছ ভারত যায় হারিয়ে হেথায় অহোরাত্র l
দেয়ালেতে মুত্র ছাড়িস মাঝ রাস্তায় মল
পথ চলাটা দায় হয়ে যায়, যাই কোথায় বল্ !
হঠাৎ তোদের জোশ্ উঠে যায় চেনা লোককে ধরা
অকারণে ঘিরে ধরে হল্লা-চিল্লা করা l
খাবার জোটে ঘুরে বেরিয়ে লম্ফঝম্ফ করিস
দলটা কেবল যায় যে বেড়ে কি ফর্মুলায় চলিস l
এলাকা দখল করে রাখিস নানা চিন্হ দিয়ে
ভিন পাড়ার কেউ এলে পড়ে হুমড়ে পড়িস গিয়ে l
মানবজাতির প্রথম বন্ধু আদ্যিকালের থেকে
মানুষ তোদের পথে ছেড়ে, ঘরে গিয়েছে ঢুকে l


কবিতা : ১) প্রস্তুতি


বাইরের কোনো বিষয়, যার সঙ্গে
পরিবারের সরাসরি কোনো যোগ নেই,
আলোচনা করতে গিয়ে, মতপার্থক্যে,
এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি, যার ফলে
পরস্পরের প্রতি বর্ষণ করি কটুক্তি l
বিষয়ান্তরে যাই, ব্যক্তিগত বিষয়ে
যুক্তি কুযুক্তির আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চলে l
কতদিন ধরে ভেতরে জমেছে বিষ !
বিষয়কে আশ্রয় করে সত্তা প্রকটিত হয়,
গোলাপ, তার কাঁটা, কীট সব নজরে আসে l


নিত্যকার জীবনে যখন হাঁপিয়ে উঠি
অসন্তোষ জমা হতে হতে জ্বালামুখ খোঁজে
বাইরের কোনো বিষয়কে ঘরে এনে
একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি l  
উত্তেজনার বশে সংকল্প প্রতিজ্ঞার ঝড় বয় l


ঝড় থামে, আবার রুটিন-বাঁধা জীবন l
কোথায় হারিয়ে যায় প্রতিজ্ঞা সংকল্পের স্মৃতি l
সম্পর্ক স্বাভাবিক, বা স্বাভাবিক থাকার অভিনয় l  
সমাজসিদ্ধ ভালবাসা ও কর্তব্যের বন্ধন l


প্রস্তুতি চলে, আবার কোনদিন বিস্ফোরিত হবার l


পরিশেষে : ছড়া, পদ্য ও কবিতার স্বরূপ সম্বন্ধে অনেক পণ্ডিত ও বিখ্যাত কবিদের বহু তাত্ত্বিক আলোচনা আছে এবং অনেক বিতর্কও আছে l আমি সেই জটিল আলোচনায় না গিয়ে এগুলির সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারনাটুকু স্পষ্ট করার প্রয়াস করেছি মাত্র l
ছড়া, পদ্য ও কবিতার সাধারণ ধারনাগুলি পুনরায় স্মরণ করি l
ছড়া - ছন্দের বাঁধন, অন্ত্যমিল, হালকা চাল, চটুল শব্দ, মজাদার - রসাত্মক বিষয়, দ্রুতপাঠ, নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই l
পদ্য - ছন্দের বাঁধন, অন্ত্যমিল, ধীর লয়, সহজ সরল ভাব, বিমূর্ততা বা রূপকতা নেই, নির্দিষ্ট অর্থ আছে, কথার রাখঢাক নেই, কবির প্রকাশিত ভাব এবং পাঠকের অনুভবের মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই l
কবিতা : অন্ত্যমিল থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে l কিন্তু ছন্দের অনুশাসন আছে l এই ছন্দের অনুভব  থাকবে কবিতার সর্বাঙ্গে l আবৃত্তি করলেই তার উপলব্ধি আসবে l ভাব প্রকাশভঙ্গি সরল নয় l  অলংকারের প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবতাকে তির্যকভাবে দেখা হয়, চিত্রকল্প সৃষ্টির শৈল্পিক প্রবণতা থাকে l কবিতায় শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে অপরূপ শব্দচিত্র আঁকা হয় যেখানে অরূপের সন্ধান চলে, অনুভূতির রসে ভিন্ন অর্থের আবহ তৈরি হয় l পাঠকমনের সৃজনশীল কল্পনা এখানে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যার অতিরিক্ত অন্য এক উপলব্ধিগত অর্থের অনুভব হয় l ইত্যাদি ইত্যদি l
ছড়া, পদ্য ও কবিতার সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারনাটুকু রাখলাম l এই ধারণার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ কবিদের রচিত ছড়া, পদ্য, কবিতা পাঠ করলে এই ধারনা আরও স্পষ্ট হবে এবং সর্বোপরি সাহিত্যের এই শাখাগুলির উপভোগেও সুবিধা হবে বলে আমার বিশ্বাস l