কবিতার নাম - কবিতা এখন কথা বলে না
কবির নাম - কবীর হুমায়ুন
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -
কবিতা এখন কথা বলে নাকো
আগুনের মতো ছড়ায় না তেজ স্ফুলিঙ্গ ;
লড়ায়ের মাঠে শাণিত অস্ত্রে বাজে নাকো আর ঝনঝন;
রাজপথ ছেড়ে প্রেমিকার হাত ধরে
কবিরা এখন বনে ও বাদারে,হাট-বাজারের -
খাবারের ঘরে
কবিতার সাথে খুনসুটি করে অবিকার l


অর্থ-ক্ষমতা লোভীর মতোন কবিরা এখন
দুর্বৃত্তায়নে মগ্ন, পুরস্কারের আর তকমার
গোপন ইচ্ছা তাদেরকে প্রবলতর প্রগলভ করে তোলে l
তোষামোদীদের মতো শব্দে শব্দে কবিতায় কবিতায় স্তুতি বাক্যে পসার সাজায় l


কবিতা হবে স্পর্ধিত শব্দের বাণী - ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র ;
কবিতা হবে কলমের আগায় বারুদের গোলা
কবিতা হবে সকল অত্যাচারী শাসকের বুকে
গণবিস্ফোরণের তীব্র যন্ত্রণা !
কবিতা হবে দুর্ভিক্ষে, দারিদ্রে
হত্যা-ধর্ষণে, দুঃশাসনে পরাক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী;
কবিতা হবে উপমায়, উৎপ্রেক্ষায়, রূপকে সঞ্জাত
শিল্পীত প্রতিরোধ - জনযুদ্ধের সারথী l


কবিতা এখন নির্বীর্য পুরুষের মতো
কুসুমিত রমণীর স্তনের সৌন্দর্যের কথা কয়,
কবিতা এখন রমণীয় রমণীর নিতম্বের ঢেউ আঁকে l
রূপজীবিদের মতো কবিতা এখন
আতর মাখা খদ্দেরের মনোরঞ্জনে পসরা সাজায় l
এক টুকরো ত্যানার মতো উত্তরীয় আর
তকমার সাথে ঝকমার হতে কতো না প্রয়াস তার !


আলোচনা -
কবিতার সৌন্দর্য্য সৃষ্টির অতিরিক্ত কোনো দায় আছে কি না - বিষয়টি বিতর্কের উর্দ্ধে নয় l যারা "Arts for Arts Sake" এর প্রবক্তা তাঁরা এরকম কোনো দায় স্বীকার করেন না l শুধু নান্দনিক মূল্যেই তাঁরা কবিতাকে বা যে কোনো শিল্পকর্মকে দেখেন l কিন্তু তাঁরা যা বলেন সেটাই তো শেষ কথা নয় l যুগে যুগে কবিতা, সাহিত্য তার নান্দনিক মূল্যের অতিরিক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক দায় পালন করেছে l কবি-লেখক সমাজ সমস্ত প্রলোভন, ভয়কে জয় করে তাঁদের লেখনীর দ্বারা আগুনের বাণী রচনা করেছেন যা উদ্দীপিত করেছে মানুষকে, জনচেতনা বৃদ্ধি করেছে, আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করেছে l শাসক শ্রেনীদের দিক থেকে নেমে এসেছে অত্যাচার l কিন্তু মুক্তমনা, অকুতোভয় কবি সাহিত্যিকদের থামানো যায় নি l বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  ইংরেজ আমলে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এর চাকরি করেও লিখেছেন "আনন্দমঠ" উপন্যাস যার অন্তর্ভুক্ত "বন্দে মাতরম" সঙ্গীতটি ভারতবর্ষে স্বাাধীনতা আন্দোলনের চরিত্রটাই বদলে দিয়েছিল l কবি নজরুল ইসলাম জেলে বসেও তাঁর অসাধারণ বিপ্লবী রচনাগুলি লিখে গেছেন l রুশোর রচনা ফরাসী বিপ্লবকে জন্ম দিয়েছে l একাত্তরের বাংলাদেশ দেখেছে বাংলাভাষার শক্তি, বাংলা কবিতার শক্তি, কবিদের রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ l অসাধারণ জীবনীশক্তি সঞ্চারিত হয়েছে মানুষের মধ্যে l এই শক্তি রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক হয়েছে l দেশে দেশে যুগে যুগে বহুবার এ জিনিস দেখা গেছে l তার জন্য কবিতার সৌন্দর্য্য, তার নান্দনিক শক্তি কখনো কমে যায় নি l
আজকের কবিতা, তার চরিত্র, তার ভূমিকা সম্বন্ধে "কবিতা এখন কথা বলে না" কবিতায় কবি সমালোচনামূলক যে বার্তা রেখেছেন তার ভিত্তি রয়েছে l কবিতা এখন লড়াই এর মাঠে শাণিত অস্ত্র নয় l সামাজিক নানা ব্যাধি - দুর্ভিক্ষ, দরিদ্র্য, হত্যা, ধর্ষণ দুঃশাসনে পরাক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নয় l পুরস্কারের লোভে, সামান্য উত্তরীয় ও তকমার প্রলোভনে একশ্রেণীর কবি-লেখক তোষামোদি রচনায়, শাসক শ্রেণীর প্রশস্তি মূলক লেখা রচনায় আগ্রহী l কবিতা এখন বিপ্লবের হাতিয়ার, জনযুদ্ধের সারথি নয় l মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে না l উপমা উৎপ্রেক্ষা,রূপক অলংকারের ব্যবহারে নান্দনিক ভাবেও কবিতা এখন সেজে ওঠে না l এখন কবিরা হাল্কা, চটুল প্রেমের কবিতা রচনায় ব্যস্ত যেখানে নারীদেহের স্থূল বর্ননা থাকে যার তুলনা করেছেন কবি রূপজীবিদের সঙ্গে, আতর মাখা খদ্দেরের জন্য যারা পসরা সাজায় l
যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম এবং শেষে যেখানে পৌঁছুলাম  - ১) কবিতা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করবে, বিষয়, ভাব, ছন্দ, অলংকার সহযোগে l বিশুদ্ধ সৌন্দর্য্য l তার কোনো সামাজিক বা অন্য কোনো দায় নেই l এটা একটা মত l
২) কবিতার সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি দায় আছে l কবিদের কলমের আগায় থাকবে বারুদের গোলা l কবিতা হবে ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র, সকল অত্যাচারী শাসকের  মনে গণ বিস্ফোরণের আতঙ্ক l  কবিতা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে অত্যাচার, শোষণ এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে l আন্দোলন, সংগ্রাম সংঘটিত হবে l এটা আর একটা মত l


কবি কবীর হুমায়ুন তাঁর কবিতায় দেখিয়েছেন বর্তমানে কবিতা এই দুটির কোনটিই করছে না l তাহলে কি করছে ? তোষামোদ করছে l পুরস্কার, সুবিধা ইত্যাদি পাবার আশায় ক্ষমতাশালীদের ও শাসকশ্রেণীকে প্রশস্তিমূলক রচনার দ্বারা তোষামোদ করছেl আর কি করছে ? রচনার মান গেছে নেমে l প্রেমের কবিতা রাজপথ ছেড়ে গলি-ঘুঁজিতে নেমেছে l পবিত্র প্রেম-তত্বের পরিবেশন ছেড়ে নারী দেহের স্থূল বর্ণনায় আজকের কবিতা ভারগ্রস্ত l এরা কাদের সঙ্গে তুলনীয় ? ঐ যারা আতর মেখে আসা খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করেন l
নিজেও কবিতা চর্চা করি l বিষয়টা নিয়ে সামান্য হলেও একটু শ্লাঘা, আত্মসম্মানবোধ ছিলো l আজ শ্রদ্ধেয় কবির কবিতায় আজকের কবিদের যা প্রশংসা পড়লাম, যা certificate পেলাম, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় l
তবে একটা শেষ আশার কথা, এই কবিতাটির মধ্যে দিয়ে কবীর হুমায়ুন সাহেব কবিদের মর্যাদার সঙ্গে সাহিত্য চর্চার, তার মহৎ দায় পালনের একটা সুলুক সন্ধান দিয়ে রেখেছেন l তাঁর কবিতা কিন্তু কথা বলেছে l  সেই পথ অনুসরণ করলে আজকের অন্য সব কবিদের কবিতাও কথা বলবে l
কবিকে তাঁর এই অসামান্য রচনার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ l