কবিতার নাম - বিশুদ্ধ পিছুটান
কবি - আরিফ মুহাম্মদ
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


জানো, ভাসমান মেঘের কোনো নাম হয় না, ঝরে পড়া বৃষ্টিরও l
তেমনি আমিও পাতাহীন শিমুলের ফুল অথবা আরতিতে শঙ্খের সুর
কিংবা পৃথিবীর চোখে মাংসের কঙ্কাল l
জয়িতা, শরতের পাতলা মেঘে মেঘে সাদা বকের সাঁতার  কাটার স্বপ্ন
আজ কেবলি ধানসিঁড়ির মতো দৃষ্টির ভুল l
গোধূলির বাতায়নে ঘরহীন রাখালের বাঁশির সুর
পাখির ডানায় এঁকে দেয় জীবনের প্রতিচ্ছবি l
মাছের চোখের মতোই বাদাম চিবানো মৃত বিকেল l
দীর্ঘশ্বাসের নদীতে বেওয়ারিশ লাশের নামান্তর l
নিশাচর পাখির মতো কাঠঠোকরা মন নিয়ে
হয়তো মুখবুকে রাতভর জেগে থাকো অন্য জোছনায়
আমার আকাশে হাসে নর্তকী চাঁদ
ফোসকা পোড়া সময়ের মুক্তি চায় জল বসন্ত দিন l
বাস্তবতার সংসারে কল্পনাকে তালাক দিচ্ছি
তবু কেন জানি পিছু ডাকে পতিতা হৃদয়
কবি, তুমি মুক্তি চাও ?
বুকে প্রেম পুষে মুক্তি হয় কি কখনো ?


আলোচনা :
কবিতাটিতে রয়েছে প্রচুর উপমা, চিত্রকল্পের ব্যবহার l     ভাসমান মেঘ, ঝরে পড়া বৃষ্টি, পাতাহীন শিমুল ফুল, আরতির শঙ্খ, মাংসের কঙ্কাল, শরতের মেঘে সাদা বকের সাঁতার কাটার স্বপ্ন, ধানসিঁড়ির মতো দৃষ্টির ভুল, গোধূলির বাতায়ন, ঘরহীন রাখালের বাঁশির সুর, পাখির ডানায় আঁকা জীবনের প্রতিচ্ছবি, মাছের চোখের মতো বাদাম চিবানো মৃত বিকেল, দীর্ঘশ্বাসের নদীতে বেওয়ারিশ লাশ, নিশাচর পাখির মতো কাঠঠোকরা মন, মুখবুকে রাতভর অন্য জোছনায় জেগে থাকা, আকাশে হাসা নর্তকী চাঁদ, ফোসকা পড়া সময়, জলবসন্ত দিন, পতিতা হৃদয়ের পিছু ডাক এবং সবশেষে - বুকে প্রেম পুষে মুক্তি পাওয়া যায় না - কবির এই বিলম্বিত বোধোদয়, যার ফলে কল্পনাকে তালাক দিয়েও তিনি তার প্রতি পিছুটান অনুভব করেন l
নিঃসন্দেহে উপমাগুলি সুন্দর, কাব্যময় এবং চিত্রকল্পগুলি যা সৃষ্টি হয়েছে তা কল্পনার চোখকে উদ্দীপিত করে, সে কবি কবিতায় কল্পনাকে যতই পরিত্যাগ করার কথা বলুন l
কিন্তু আমি বলতে চাইব কবিতায় উপমা ও চিত্রকল্পের অত্যধিক ব্যবহার প্রসঙ্গে কিছু কথা l  
কবিতার থাকে একটি দৃশ্যমান চেহারা এবং সেই অবয়বকে আকর্ষণীয় করবার প্রয়োজনে থাকে নানা কাব্যিক প্রকৌশল l ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য কবিতার দৃশ্যমান চেহারা নির্মাণ করে l আর ছন্দ, নানা ভাষা অলঙ্কার যেমন উপমা, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প সেই ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে l আমরা জানি সাজগোজ - তার একটা সীমা আছে l মানবদেহ - পুরুষ বা নারী, তার নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে l এর ওপরে অলঙ্কার ইত্যাদি ব্যবহার করলে সেই সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় l কিন্তু সেই সাজগোজেরও একটা সীমা থাকে l সাজগোজ এতটা না হয় যে শরীরের নিজস্ব সৌন্দর্য আর নজরেই এলো না, তা উপেক্ষিত থেকে গেল l
বর্তমান কবিতাটিতে এরকমটাই হয়েছে বলে আমার পর্যবেক্ষণ l প্রথম পঙ্ক্তি থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি অংশে এত বেশি উপমা, চিত্রকল্প ব্যবহার করা হয়েছে যে কবিতাটির মূল বার্তা বহন করবার জন্য সাধারন শব্দ, বাক্য ব্যবহার করার অবকাশ তৈরি হয় নি এবং ফলতঃ কবিতাটির দৃশ্যমান চেহারাটি দাঁড়াতেই পারে নি l
এমনিতে উপমাগুলি সুন্দর l কিন্তু উপমায় উপমায় আসল কবিতাটি হারিয়ে গেছে l
থিম এর দিক থেকে একটা বিষয় খুব স্বস্তিদায়ক ঠেকেছে l সেটা হলো অন্তরে চিরস্থায়ী প্রেমের অস্তিত্ব অনুভব এবং তার শক্তিতে তালাকরূপ বিশ্বাস-ভাঙ্গা ও হৃদয় বিদারী একতরফা মুক্তির সিদ্ধান্তের কার্যকারিতাকে খারিজ করা l
অমর প্রেমের এই বার্তা দিয়ে কবি তার কবিতাটিতে জীবনমুখী, স্বাস্থ্যকর বাতাস প্রবাহিত করেছেন l