২১. অগ্নিতে যার আপত্তি নেই  ২২. অহংকার  ২৩. শৈশবের সেকাল একাল  ২৪. চৈত্রের দুপুরে তরুণ এক


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ২১
কবিতার নাম - অগ্নিতে যার আপত্তি নেই  
কবির নাম - নির্মলেন্দু গুণ
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -
থামাও কেন? গড়াতে দাও,
গড়াক;
জড়াতে চায়? জড়াতে দাও,
জড়াক ।


যদি পাকিয়ে ওঠে জট,
তৈরি হবে নতুন সংকট
সুখ না হলে দুঃখ দিয়ে
পূর্ণ হবে ঘট ।


ডরাও কেন? এগোতে দাও
জাগুক;
সরাও কেন? আগুনে হাত
লাগুক ।


জীবন শেষে মরণ হয়,
মরণ শেষে হয় কী?
আগ্নিতে যার আপত্তি নেই
মাটিতে তার ভয় কী?


আলোচনা -


কবিতাটি অসাধারণ শক্তিসম্পন্ন l যারা বিপ্লব সংগ্রামের পথে চলে, তাদের অনুপ্রাণিত করার মতো কবিতা l বিপ্লবীরা বিপদকে আলিঙ্গন করে চলে l বড়ো বড়ো বিপদকে তারা তুচ্ছ জ্ঞান করে, ছোট ছোট বিপদকে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না l মা, বাবা, অভিভাবকদের কাছ থেকেও তাঁরা অনুপ্রাণিত হন l আন্দোলন সংগ্রামের পথে চলতে গেলে সংকোচ জড়তা জয় করে এগিয়ে যাবার প্রেরণা পান তাঁরা বাড়ি থেকেই l "এগুতে চায়, আগাক". "জড়াতে চায়, জড়াক". সংকট তীব্র হবে, হোক l যার মৃত্যুভয় নেই, সে ছোটখাটো বিপদকে কেন ভয় করবে ? অগ্নিতে যার আপত্তি নেই, কোনো আতঙ্কই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না l
অসাধারণ সুন্দর বীর রসাত্মক এক বিপ্লবী কবিতা l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ২২
কবিতার নাম - অহংকার
কবির নাম - হেলাল হাফিজ
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


বুকের সীমান্ত বন্ধ তুমিই করেছো
খুলে রেখেছিলাম অর্গল,
আমার যুগল চোখে ছিলো মানবিক খেলা
তুমি শুধু দেখেছো অনল।


তুমি এসেছিলে কাছে, দূরেও গিয়েছো যেচে
ফ্রিজ শটে স্থির হয়ে আছি,
তুমি দিয়েছিলে কথা, অপারগতার ব্যথা
সব কিছু বুকে নিয়ে বাঁচি।


উথাল পাথাল করে সব কিছু ছুঁয়ে যাই
কোনো কিছু ছোঁয় না আমাকে,
তোলপাড় নিজে তুলে নিদারুণ খেলাচ্ছলে
দিয়ে যাই বিজয় তোমাকে।


আলোচনা :


অহংকার - সুন্দর সার্থক সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে প্রাচীর এক l একদিকে যুগল-চোখে মানবিক আবেদন l সেই আকর্ষণে প্রেম দেয় ধরা l কিন্তু নৈকট্য অহংকারেরর চোখকে শুধু অনল দেখায় l খামখেয়ালী অহংযুক্ত প্রেম নিজেই ধরা দেয়, আবার নিজেই হয়ে যায় অধরা l ভালোবাসার সম্পর্কে সীমান্তের সীল পড়ে l এক পক্ষ অর্গল খোলা রাখলেও যোগাযোগ বন্ধ অন্যপক্ষের অহংবোধের তাড়নায় l কথা দিয়েও অহংকারী প্রেম কথা রাখে না l পরাজিত ভালবাসা অক্ষমতা, অপারগতার ব্যথা নিয়ে বাঁচে l প্রাণপণ চেষ্টায় প্রেমকে ছুঁতে চায় l কিন্তু বাধা হয় প্রেমিকার সেই অহংবোধ l প্রেম তাকে স্পর্শ করে না l নিজের জীবনকে তোলপাড় করে দিয়েও, নিজের হার স্বীকার করার মধ্যে দিয়ে প্রেমকে জয় উপহার দেয় ব্যর্থ প্রেমিক l
নিঃস্বার্থ ভালবাসা অহংকারের কাছে পরাজিত হয় l নাকি নিজের ভালবাসাকে জয়ী করে দিয়ে একটা পরোক্ষ জয়ের আস্বাদ পায় l
বিশিষ্ট কবি হেলাল হাফিজের "অহঙ্কার" কবিতাটি পড়ে আমার এরকম অনুভব হয়েছে l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ২৩
কবিতার নাম - শৈশবের সেকাল একাল
কবির নাম - অনিরুদ্ধ বুলবুল
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


কবি অজিত কুমার করে'র "ফেলে আসা শৈশব" শীর্ষক কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা কবিতাটি তাঁকেই উৎসর্গ করছি -


কত স্মৃতি শৈশবের শত সোহাগের
দিনমান কত খেলা কত আয়োজন
খেতে হ'ত কাড়াকাড়ি ভাই-বোনেদের
পড়ার কথায় জ্বর আসত তাদের।
আজকের শিশুগণ পড়ে দিয়ে মন
সেরার সেরাটি হবে এ-পণ তাদের
চেনে না খেলার মাঠ কি'বা নদীতীর
স্নেহ-প্রীতি আদরের করে না যতন।


স্মৃতিঝরা দিনগুলো কী করে হারায়
সেইসব কভু আর আসবে না ফিরে
শরীরের চেয়ে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে
শিশুগণ হেঁকে চলে প্রতিযোগিতায়
খেলা-মেলা বিনোদন মুছে যায় ধীরে
শিশুকালে যেন তারা যাবে বুড়ো হয়ে।


আলোচনা :


সনেট ও তার গঠন রীতির মধ্যে যাচ্ছি না l এমনিতে বহিরঙ্গে দেখলাম ১৪ চরণ, প্রতিটি চরণে ১৪ বর্ণ, অষ্টক, ষষ্টক - সনেটের এই ধর্মগুলি তো মানা হয়েছে l আমি সনেট হিসাবে নয়, কবিতা হিসাবে লেখাটিকে পড়েছি l
কবিতার শিরোনাম - "শৈশবের একাল সেকাল" l এটা আকাঙ্খিত ছিলো কবিতাটির অষ্টক অংশে একালের শৈশবের বর্ননা থাকবে এবং ষষ্টক অংশে সেকালের শৈশবের বর্ণনার শেষে একটা সুন্দর উপসংহার জাতীয় পদ রচনার মধ্যে দিয়ে কবিতাটি শেষ হবে l
কিন্তু দেখলাম অষ্টক অংশ শুরু হচ্ছে সেকালের শৈশবের বর্ননা দিয়ে l পঞ্চম চরণে একালের শৈশবে আসা হলো l তারপর ষষ্টক অংশে প্রথম দু চরণ সেকালের শৈশবের একটু স্মৃতি, তারপর পরের শেষ চার চরণে আজকের যান্ত্রিক শৈশব, চাপের শৈশব, প্রতিযোগিতার শৈশবকালকে ধরা হয়েছে কবিতায় l
কবিতার শিরোনামে যে ক্রমনির্দেশ ছিলো সেই অনুসারে পরপর বিষয়গুলি কবিতায় আসলে ভালো হত বলে আমার মনে হয় l
সর্বোপরি, কবিতাটি পাঠে আনন্দ আছে l বিষয়টি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া l সেই অভিজ্ঞতার সুন্দর কাব্যরূপ l  


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ২৪
কবিতার নাম - চৈত্রের দুপুরে তরুণ এক  
কবির নাম - গোলাম রহমান
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


চৈত্রের দুপুরে তরুণ এক আকাশ মুখী
চারিদিকে খোলা প্রান্তর
শরীর ঘিরিয়া তার খেলা করে
খরতাপের অনুজ্জ্বল বলয়
মনে হয় যেন,-
কোনোও দেবদূতের স্বর্গ-গমন প্রস্তুতি!


আকাশে এখন নেই কোনো তারা
তবু চোখ তার আকাশেই নিবিষ্ট নিবদ্ধ;
নেই কোনো ছিটেফোঁটা মেঘের আভাস
যা গলে বহিতে পারে বারিধারা
তবু চোখ তার আকাশেই নিবিষ্ট নিবদ্ধ!


চারিদিকে খোলা প্রান্তর
গগনে-মর্তে-মলয়ে একাকার,
খেলা করে উত্তপ্ত লু হাওয়া
শুধু ঊর্ধ্বমুখী তরুণ এক অনড় অরব
কোনো এক চৈত্রের দুপুরে!


আলোচনা :


বর্ণনা প্রধান কবিতা l চৈত্রের খরতাপ দুপুর l তার সুন্দর চিত্রকল্প l দেবদূত সম এক আকাশমুখি তরুনের স্বর্গগমন প্রস্তুতি l স্বর্গ এখানে নিশ্চয় কোনো লক্ষ্য, আদর্শের প্রতীক l আর চৈত্রের খরতাপ, লু হাওয়া প্রতিকুল পরিবেশের l
কিন্ত গগন, মর্ত, মলয় একাকার, মেঘমুক্ত আকাশ তরুনকে উৎসাহ দেয় লক্ষ্যে অবিচল থাকতে l সুন্দর প্রকাশ l
শুধু একটা চিত্রকল্প কেমন ঠেকল l চারদিক খোলা, মেঘমুক্ত চৈত্রের দুপুর, খরতাপ - তার মধ্যে তরুনের শরীর ঘিরে যে বলয়  তা অনুজ্জ্বল কেন ?
এরকম ব্যাখ্যা করা যাবে কি ? ঐ অনুজ্জ্বল বলয় তরুণটির চারপাশে প্রতিকূল পরিবেশের প্রতীক ? যা তাকে স্বর্গারোহণে অর্থাৎ কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে বাধা দিচ্ছে ? অশুভ শক্তি - তাই কি অনুজ্জ্বল ?
প্রকৃতি চিত্রনের সুন্দর কবিতা উপহার দেবার জন্য কবিকে ধন্যবাদ l


উক্ত কবির পাতায় এই বিশ্লেষণের উত্তরে কবিকর্তৃক কবিতার বোধের উপর কিছু আলোকপাত  l
গোলাম রহমান ১০/০৪/২০১৭, ১৭:৪৪ মি:
অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয়...
কবিতার বিশ্লেষন করতে গিয়ে অনুজ্জ্বল প্রশ্নে আটকে গেছেন। এর উত্তর অনুজ্জ্বল বলয় প্রাকৃতিক। আর তরুনের শরীর ঘিরে উজ্জ্বল বলয় হলে সেটা হত অতিপ্রাকৃতিক l আমি সে দিকে যাই নি।
প্রিয় কবির জন্য এক রাশ রক্তিম শুভেচ্ছা ও গভীর ভালোবাসা l


কবিতার পাঠোদ্ধারে আসরের কবিগণ যদি আলোচিত কবিতাটি সম্পর্কে এইভাবে তাদের মনোভাব প্রকাশ করে পাঠক-আলোচকদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন, তাহলে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে যে অভিযোগটা করা হয়, আধুনিক কবিতা নাকি দুর্বোধ্য, সংবাদপত্রের স্তম্ভের মতো কবিতার আকারে সাজানো কিছু অর্থহীন, ভাবহীন কথার সমষ্টি - এই জটটাই কেটে যাবে l আধুনিক কবিতা কিছু পাঠকের কাছে যদি তার অর্থ, তার আনন্দভাব তার নিজ অবয়বে মেলে ধরতে না পারে. সেক্ষেত্রে কিছু উৎসাহী পাঠক-আলোচক এবং কবি স্বয়ং যদি সেই কবিতার পাঠোদ্ধারে এগিয়ে আসেন , সে তো কবিতার পক্ষে ভালোই l এতে করে কবিতা পাঠকের সংখ্যা বাড়বে এবং কবিতা চর্চার পথ প্রশস্ত হবে l