কবিতার নাম - সঙ্গে আছি
কবির নাম - মধু মঙ্গল সিনহা
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -
আমি যখন কুমারী ছিলাম,
স্কার্ট শার্ট পড়ে স্কুলে যেতাম,
ভালবেসে অথবা ছলনায়
বলতে তুমি "সঙ্গে আছি" l
একটু বড়ো হলাম শরীরে,
কিন্তু বুদ্ধিতে ঐ ছোটই ছিলাম,
তুমি তখনো বলেছ "সঙ্গে আছি" l
আমি বিশ্বাস করেছিলাম,
অবশ্যই ভালোও বেসেছিলাম
তোমাকে শত প্রতিকূলতার মাঝেই l
তাই তো হেঁটেছিলাম ঐ ছায়া
পথে তোমারই তৃষ্ণা মেটাতে l
আমি কলেজ পড়েছি আবারও
বিশ্বাস করেছি তোমার ঐ
পুরাতন "সঙ্গে আছি" কথাটিতে l
এবার বিয়ে ঠিক হল,
বিয়েটা আমার হয়েও গেল l
তখনও তুমি ভ্রুক্ষেপ করোনি,
আবারও শান্তনা দিলে "সঙ্গে আছি"
ঐ মুখস্থ করা কথাটি বলে l
ভাগ্যের বিপাকে বৈধব্যে আমি আজ,
আবারও তোমার ঐ ""সঙ্গে আছি"
শান্তনার বাণী বারে বারে শুনি,
এবারও তুমি হাতছানি দিলে মোরে,
তোমার ঐ রাঙা ছাতির তলে;
"সঙ্গে আছি" এই চির মিথ্যা,
মিথ্যা আর মিথ্যা কথাটি বলে l


আলোচনা :
কবিতাটিতে এক নারীর স্কুলবেলা, কলেজজীবন, বিবাহ মুহূর্ত, বৈধব্যকাল - জীবনের এই বিভিন্ন পর্যায়ে তার এক বন্ধুর "সঙ্গে আছি" এই প্রতিশ্রুতির প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে l "সঙ্গে আছি" এই কথাটির অর্থের যে বহুধার ব্যাপ্তি আছে  - তা কবিতাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই নারী উপলব্ধি করেন নি l কথাটির একটিমাত্র অর্থ তিনি যা করেছেন তা হলো বিবাহ এবং সঙ্গে আছি এই কথা বারবার বলা সত্বেও সেই পুরুষ বন্ধু যেহেতু তাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন নি, তাই সেই নারীর কাছে পুরুষটি মিথ্যাবাদী বলে প্রতিপন্ন হয়েছেন l
কবিতার ধর্ম হলো এখানে ব্যবহৃত শব্দাবলীর অর্থ সবসময় একেবারে সহজ সরল থাকে না, ভিন্ন অর্থের অবকাশ থাকে l পাঠক হিসাবে আমি "সঙ্গে আছি" এই কথাটিকে যে অর্থে গ্রহণ করেছি, তার বিচারে পুরুষ বন্ধুটিকে মিথ্যাচারী বলে মনে হয় নি l বরং তাঁকে এক প্রকৃত বন্ধু হিসাবেই পেয়েছি যিনি সঙ্গে আছি এই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করেছেন বরাবর l তিনি মহিলাটিকে কখনও এড়িয়ে যান নি, পালিয়ে যান নি, সর্বদা পাশে থেকেছেন l স্কুল জীবনে, কলেজ জীবনে,  মেয়েটির বিয়ের সময়, এমনকি যখন দুর্ভাগ্যক্রমে বৈধব্য  এসেছে মেয়েটির জীবনে, তখনও পুরুষ বন্ধুটি তাঁকে বিয়ে হয়তো করেন নি, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়েছেন l পাশে দাঁড়ানো কথাটির বাঙলা ভাষায় একটি অর্থ আছে এবং সেই অর্থেই আমি কথাটিকে গ্রহণ করলাম l ফলে পুরুষ বন্ধুটির সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি মিথ্যা ছিলো না l
মেয়েটিকে পুরুষ বন্ধুটি তার বৈধব্যকালে তার রঙ্গীন ছাতার মধ্যে আশ্রয় দিয়েছেন l এখানে ঠিক কি অর্থ দাঁড়িয়েছে বিষয়টি অনুমান নির্ভর l রঙ্গীন ছাতা তো ! ফলে এখানে কোনো ব্যঞ্জনা থাকতেই পারে l
কিন্তু সাধারন ভাবে বাঙলা ভাষায় কারও ছাতা হওয়া বা কারও মাথায় ছাতা ধরা - এই কথাটির যা অর্থ হয় সেই বিচারেও পুরুষ বন্ধুটি সেই নারীর কাছে একজন আদর্শ বন্ধু থেকেছেন l
কবিতাটির আরও কিছু জায়গায় এমন কিছু শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে যেগুলির নানা অর্থ হতে পারে এবং অর্থভেদে পুরুষটি সম্বন্ধে ধারণাটি পাল্টে পাল্টে যেতে পারে l যেমন, চতুর্থ পঙক্তিতে পুরুষ বন্ধুটির "সঙ্গে আছি" প্রতিশ্রুতিতে মেয়েটি দোলাচলে, এটা ভালবাসা, নাকি ছলনা, তিনি নিশ্চিত নন l ছয় সাত পঙক্তিতে এসে মেয়েটি নিজেই যা বলছেন তাতে করে তার বিচারশক্তি ও বোধশক্তির ওপর আমাদের আস্থা থাকার কথা নয় l তিনি স্বীকার করছেন তিনি বড়ো হয়েছেন  শরীরে, কিন্তু বুদ্ধিতে ছোটই থেকে গেছেন l নবম-দশম পঙক্তিতে এসে সন্দেহ বিসর্জন দিয়ে তিনি পুরুষ বন্ধুটিকে বিশ্বাস করেছেন,  সঙ্গে ভালোও বেসেছেন  - সে কথা বলছেন l বারো-তেরো পঙক্তিতে পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ছায়া ভরা পথে হাঁটা, তার তৃষ্ণা মেটানো - এগুলি কি অর্থে ব্যবহৃত তার ওপর নির্ভর করছে তাদের সম্পর্কটা কি পর্যায়ের ছিলো l তারা কি শুধুই বন্ধু ছিলো, না কি তাদের মধ্যে এর অতিরিক্ত আরও কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ? কিসের তৃষ্ণা মিটেছিলো ?
একুশ পঙক্তিতে এসে মেয়েটি বুঝতে পারছেন, পুরুষ বন্ধুটির "সঙ্গে আছি" কথাটা মনের কথা নয়, শুধু মুখস্থ করা একটি বুলি l
তারপর মেয়েটি যখন দুর্ভাগ্যক্রমে বৈধব্যের শিকার, তখন কবিতাটির পঁচিশ পঙক্তিতে ছেলেটি মেয়েটিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন l একটি বিধবা মেয়েকে একজন পুরুষ মানুষ যখন হাতছানি দিয়ে ডাকে, নিজের রাঙা ছাতার নিচে আশ্রয় দেয়, তখন তার কি অর্থ দাঁড়ায় ?
মেয়েটি যে কবিতার শেষ অংশে এসে তার পুরুষ বন্ধুটিকে মিথ্যাবাদী বলছেন, এর কারণই হচ্ছে, যে জায়গায় অর্থগুলো নির্দিষ্ট হলো না, মেয়েটি তার নিজের অভিজ্ঞতায় তার শেষ সিদ্ধান্তের অনুসারী করে এই অর্থগুলো তার নিজের মতো করে বুঝেছেন l  একান্তই তার ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি l বন্ধুত্বের যে ব্যাপকতা তার উপলব্ধি তার হয় নি l
একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তিনি বিয়ের সম্পর্কের বাইরে অন্য কোনো রূপে গ্রহণ করতে পারেন নি l এটা তাঁর দুর্বলতা l
এখন কবি কি অর্থে "সঙ্গে আছি" কথাটিকে কবিতায় ব্যবহার করেছেন, তা অনুমান সাপেক্ষ l
অনেক ভাবনাকে জন্ম দেবার শক্তিসম্পন্ন এই কবিতাটি লেখার জন্য কবিকে ধন্যবাদ l