১৭. নববর্ষের কাব্য ১৮. জীবনের অর্থ ১৯. জ্যোৎস্নাময়ী প্রাণতোষী ২০. খোদা দ্রোহীদের জন্মটা বোধহয় কলাগাছ ফেড়েই হয়


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১৭
কবিতার নাম - নববর্ষের কাব্য
কবির নাম - স্বপন কুমার মজুমদার  
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


সৃষ্টি মুখর ছন্দে নব
নতুন দিনের বার্তা হব।
নতুন আলোর স্পর্শ পেয়ে
ভৈরবী সুর উঠব গেয়ে।
গহীন মনের ভুবন ডাঙা
হোক প্রভাতের আলোয় রাঙা।
দীপ্তি ঢালা সেই আলোতে
শুদ্ধ হতে, স্নিগ্ধ হতে
আবার জাগি নতুন ভোরে
নতুন শুভ এই বছরে।

আলোচনা -


ছন্দ আছে, গানের ভৈরবী সুর আছে,  মনের গহীন দর্শন আছে, নতুন আলোর রঙ আছে, শুদ্ধতার অনুভব আছে, শপথ আছে, আশার আলো আছে - আর ছোট্ট কবিতাটির সর্বাঙ্গে আছে এক ঢেউ এর অনুভব, যা মনকে দোলা দেয়, কবিতার সুরে, ছন্দে দেহ নেচে ওঠে l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১৮
কবিতার নাম - জীবনের অর্থ
কবির নাম - মধু মঙ্গল সিনহা l  
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


জীবনের অর্থ খোঁজা বড় দায়,
স্বার্থক না কি ব‍্যর্থ আমি;
খোজে চলি বর্তমান থেকে-
অতিতের ঘুর্ণি ঝড়ে!


কিসে কে খুশী হয় বুঝা বড় দায়।
কেউবা কাটায় রাত শুধু প্রতীখ্যায়,
কারোবা আনন্দ হয়-
ত্যাগ ও তিতীখ্যায়।
জীবনের রাস্তা বড় ভঙ্গুর,
চোখ মুদে চলা দায়।
কোথাও মসৃণ হলে-
আবার ক্লেশময়।


কেউ দেখে খুশী হয়,
কেউ আবার অগ্নিময়।
জীবনে বিজয়ী হ‌ওয়া-
বড় কষ্টময়।


কেউ খেয়ে খুশী-
কেউ খায়িয়ে হয়।
জীবনের অর্থ খোঁজে-
খোঁজে হয় শুধু বিশ্বয়,আর‌ও বিশ্বয়!


আলোচনা -


কবিতাটির বিষয় গুরুগম্ভীর l কবি নিজের মতো উত্তর খুঁজেছেন l সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা চলছে l ধর্ম, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য সব ক্ষেত্রে খোঁজ চলছে l উত্তর যতটা মিলেছে, নিরুত্তর রয়েছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী প্রশ্ন l আপনিও খুঁজেছেন l নিশ্চিত হতে পারেন নি - যা উত্তর পেয়েছেন, সেটা সঠিক কি না l মানুষের বিচিত্র পরস্পরবিরোধী কার্যকলাপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন l এই বিস্ময়-বোধই জীবনের মাহাত্ম্য l এখানেই জীবন অমূল্য l এই বিস্ময়-বোধ সৃজনশীলতার জন্মদাতা l যুগে যুগে এই বিস্ময়বোধ বেঁচে থাক l সব প্রশ্নের উত্তর মিলে গেলে শিল্প, সাহিত্য, সৃজনশীলতা ধ্বংস হয়ে যাবে l
কবিতাটি শ্রুতিমধুর, গতিময় l ছন্দ আছে l তবু একটি কথা না বললেই নয়, বহু শব্দের ভূল বানান দৃষ্টিকটু লেগেছে l বানান সম্বন্ধে যত্ন নিবেন l কবিতায় বানান ভূল থাকলে কবিতার সম্মানহানি হয় l


কিছু বানান সংশোধন করলাম -
স্বার্থক - সার্থক,  অতিতের - অতীতের
প্রতীখ্যায় - প্রতীক্ষায়  তিতীখ্যায় - তিতিক্ষায়
খায়িয়ে - খাইয়ে   বিশ্বয় - বিষ্ময়


এই বানানগুলো কবিতায় সঠিক থাকলে কবিতাটি আপনার ওপর রাগ, অভিমান করত না l
যাই হোক, "তারুণ্য" থেকেই আপনার কবিতা ভালো লাগে l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১৯
কবিতার নাম - জ্যোৎস্নাময়ী প্রাণতোষী
কবির নাম - কবীর হুমায়ুন
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


জ্যোৎস্নাময়ী! যাও না যতোই দূরে,
বাজবে তোমার শ্যাম-কিশোরের বাঁশি
নতুন শব্দের নতুন ভাবের সুরে;
তোমার নামে হই যে পরবাসী।


নীল পূর্ণিমার নিশুত কালের রাতে
যাক না চলে যে যার যেদিক খুশি;
কী প্রয়োজন জীবনের সংঘাতে?
থাকুক মনে চেতনা-প্রাণতোষী।


জলের রঙে আঁকি তোমার ছবি
করতে বরণ কলমী ফুলের মালায়;
সন্ধ্যাবেলায় ডুবে ত্রস্ত রবি,
বিভাবরীর ছোঁয়ায় দিবস পালায়।


বিলের ধারে বেঁধেছি যে ঘর,
রাখলে না খোঁজ নড়বড়ে তার রূপ;
আনন্দ সব লুটায় ধুলার 'পর,
তীব্র দহন পোড়ায় ব্যথার ধূপ।


সাক্ষী রইলো দূর আকাশের তারা,
মাটিগন্ধী ধূসব ব্যাঙের ছাতা;
বিলের জলে খেলতে আসে যারা,
সাক্ষী রইলো বনের সবুজ পাতা।


আমরা দু'জন জাতিস্মরের ছায়া,
লক্ষ যোনির ভ্রমণ শেষে আসি;
অন্তর-আবেগ, মূল্যহীন এ কায়া,
পরস্পরকে শুধুই ভালোবাসি।


আদম হতে এই কবীরের প্রাণ,
হাওয়ার মাঝে সুখ যাচিয়া যায়,
নিত্য সুখের চিত্ত গাহে গান,
অহর্নিশি প্রাণতোষী প্রাণ চায়।


আলোচনা -


কবি কবীর হুমায়ুন "জ্যোৎস্নাময়ী প্রাণতোষী" কবিতাটিতে প্রেমভাবনার জয়গান গেয়েছেন l একের এই অনুভবকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছেন l
প্রেমের অনুভব চিরন্তন l পৃথিবীর প্রথম মানব আদম তার নারী সঙ্গী ঈভের প্ররোচনায় যেদিন স্বর্গের নন্দনকাননে মানুষের জন্য নিষিদ্ধ জ্ঞানবৃক্ষের ফল  আস্বাদ করেছিলেন, সেদিনই পেয়েছিলেন প্রেমের প্রথম অনুভব l অর্থাৎ প্রেমের অনুভব জ্ঞান বিকাশের ওপর নির্ভরশীল l শৈশব কৈশোর অতিক্রম করে আমরা যখন যৌবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছয়, দৈহিক ও বৌদ্ধিক  জ্ঞান বিকাশের এই পর্যায়ে আমরা পাই প্রেমের সেই অনুভব, যখন প্রিয়াকে আকর্ষিত করার জন্য শ্যামের সুরেলা বাঁশি বেজে ওঠে, ভাবময় ছন্দময় শব্দের খেলায় প্রিয়ার বন্দনা চলে, জগৎ সংসার ভুলে প্রেমভাবনার রঙ্গীন জগতে প্রেমী পরবাসী হয় l জলছবি, কলমি ফুলের মালা - নানা অনুষঙ্গে প্রিয়াকে বরণের প্রস্তুতি চলে l কর্মচঞ্চল দিনের অবসান হয়, সন্ধ্যার আলো-আঁধারি বিজন মুহূর্তে প্রেমভাবনা সক্রিয় হয়ে ওঠে l প্রিয়াকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্নে মন আকুল হয়ে ওঠে l আবার যেখানে আকর্ষণ, সেখানেই বিকর্ষণের ভীতি l উপেক্ষার আশঙ্কা l প্রেমময় অনুযোগ l বিরহ ব্যথা l
চিরটা কাল প্রকৃত প্রেমের সাক্ষী এই প্রকৃতি l প্রকৃতির মধ্যে পাই প্রেমের নিঃসঙ্কোচ স্বীকৃতি l জন্ম জন্মান্তরের এই প্রেম বন্ধন কখনও দৈহিক, আবার কখনও প্লেটনিক l সব রূপেই প্রেম এক চিরন্তন সত্য l
প্রকৃত প্রেমের অনুভব যারা পায়, জীবনের অন্য ছোট ছোট না পাওয়ার বেদনা তাদের বিদ্ধ করে না l দেহসুখের অতিরিক্ত এক অতীন্দ্রিয় প্রেমরসে তারা নিমজ্জিত হন l স্থূল জীবন যাপনের সংগ্রাম-সংঘাত তাদের ছুঁতে পারে না l
প্রেম শুধু সুখ দেয় না, যন্ত্রনাও দেয় l সেই যন্ত্রণার অনুভবের মধ্যেও প্রেমী পান এক অনাবিল সুখের অনুভূতি l
প্রেম সন্ধানে উদ্বেল কবি তার প্রেমসুখ, তার যন্ত্রনা কবিতায়, গানে মেলে ধরেন l
কবি কবীর হুমায়ুনকে অসংখ্য ধন্যবাদ তাঁর রচনায় চিরন্তন প্রেমের জয়গান ধ্বনিত করার জন্য l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলচনা - ২০
কবিতার - খোদা দ্রোহীদের জন্মটা বোধহয় কলাগাছ ফেড়েই হয়
কবির নাম - মোহম্মদ বোরহান উদ্দিন
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


পৃথিবী'র সহস্র কোটি বাবা'দের ভিড়ে
আমি কাকে বাবা বলে ডাকি?
অথচ,
এইসব ত্রিকোণমিতিক জীবনের
হিসেব-নিকেশ ভূলে গিয়ে
শু'য়ে আছি বাবা নামক প্রকাণ্ড এক
বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়া তলে।


আমি সৃষ্টি'তে বিশ্বাসী,
সৃষ্টিকর্তা'য় নয়!
মায়ের পবিত্র প্রসব ব্যাথা ভূলে গিয়ে
পাগলের এক প্রলাপ ব'কি;
মা'য়ের ভ্রূণে নয়,
তোমরা যারা খোদা দ্রোহী,
তোমাদের জন্মটা বোধহয় কলাগাছ ফেড়ে'ই হয়।


খোদা বিদ্বেষী'দের ঢের জেনে রাখা উচিৎ;
ধর্ম মানে উগ্রতা আর
সন্ত্রাসবাদ নয়।
ধর্ম বা'দে মানবতা নয়
ধর্ম তো মানবতার'ই কথা কয়।


আলোচনা -


কবিতাটিতে কতগুলি শব্দ আছে - যার ওপর কবিতাটি দাঁড়িয়ে আছে l কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে শব্দগুলি দিয়ে l ধারণাগুলি আবার পরস্পর বিরোধী থেকেছে l ফলে কবিতাটির মূল ভাব খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে l কবিতার শুরুতে কবি তাঁর বাবার পরিচয় সম্বন্ধে নিশ্চিত নন l দ্বিতীয় স্তবকে এসে বলছেন বাবা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তায় তিনি বিশ্বাসই করেন না l অথচ প্রথম স্তবকের শেষে কবি বলছেন বাবারুপী শীতল ছায়ার তলে তিনি শুয়ে থাকেন l বক্তব্য স্বচ্ছ নয় l বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে l
বাবা প্রসঙ্গ গেল l এবার মায়ের প্রসঙ্গ l মায়ের প্রসব যন্ত্রণাকে কবি পবিত্র বলছেন l ভালো কথা l কিন্তু পরক্ষণেই মায়ের এই যন্ত্রণার কথা ভুলে গিয়ে তিনি পাগলের প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন l তা সেই প্রলাপবচনটি কি ? কবি বলছেন, মায়ের ভ্রূণ থেকে নয়, তাঁর জন্ম হয়েছে কলাগাছ ফেড়ে l অর্থাৎ, বাবাকে তো অস্বীকার করেছেন, এখানে মা-কেও অস্বীকার করলেন l
কবি বলছেন, তিনি সৃষ্টিতে বিশ্বাসী, সৃষ্টিকর্তায় নয় l মা ও বাবার মিলনে সন্তান সৃষ্টি হয়, একথা পাগলেও জানে l যদি মা ও বাবাকে অস্বীকার করা হয়, তাহলে সৃষ্টি কি করে বাঁচে, কবি সেই বিকল্প তত্বটা দেন নি l একটা কথা বলেছেন, কলাগাছ ফেড়ে জন্মের কথা l এই কথাটির কি ব্যঞ্জনা, কলাগাছ ফেড়ে জন্ম কবে কার হয়েছিল, তারা সবাই নাস্তিক হয়ে জন্মেছিলেন নাকি, বিষয়টি না জানা থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না l
দ্বিতীয় স্তবকে কবি নিজেকে "খোদা দ্রোহী" অর্থাৎ খোদা বিদ্বেষী বলছেন l আর শেষ স্তবকে এসে তিনি বলছেন ধর্ম মানবতার কথা বলে - এটা খোদা দ্রোহীদের জানা উচিত l নিজেই নিজেকে বলছেন ? যদি নিজে তিনি খোদা দ্রোহী হন, তাহলে তাঁর যুক্তি অনুযায়ী.তাঁর তো ধর্মের মর্মবাণী জানার কথাই নয় l তাহলে হঠাৎ এই জ্ঞান তাঁর এলো কোথা থেকে ?
এমনিতে কবিতা ভাবের, আবেগের কথা বলে l কিন্তু আধুনিক গদ্য কবিতা চিন্তন ও মনন জগতের জটিল কোনো বিষয় নিয়ে যখন লেখা হয়, তখন ঝরঝরে গদ্যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মূল বিষয়টাকে, তার অন্তর্গত বিতর্ককে যুক্তিসঙ্গত ভাবে কবিতায় মেলে ধরা হয় l আধুনিক মননশীল পাঠক এই জাতীয় লেখাকে উপভোগ করে l
আলোচ্য কবিতাটিতে কবির কথা বলার ভঙ্গিটি আকর্ষণীয় l কিন্তু লজিক এত এলোমেলো মনে হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত কার যে কি পরিচয়, কার বিশ্বাস যে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, বিষয়টা পরিষ্কার হয় নি l