৯. বিয়ের পোস্টমর্টেম ১০. বোধ আর বেধ
১১. ঊরুক্কু শনির মুকুট  ১২. অনুস্টুপ ছন্দ


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ৯
কবিতার নাম - বিয়ের পোস্টমর্টেম
কবির নাম - প্রবীর চ্যাটার্জি
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


দিব্বি গেলাম বিয়ে করতে শোলার টুপি পড়ে
কে জানতো আছোলা বাঁশ পড়বে আমার ঘাড়ে !


ছাদনা তলায় মালা বদল হলো ঘটা করে
চোখেতে চোখ মিলিয়ে আনলাম তাকে ঘরে


শয়নে স্বপনে হেরি এখন শুধু সর্ষেফুলের শোভা
ছটফট করি ঘুম যায় ছুটি আতঙ্কে হই বোবা !


এই কি ছিল বিধাতার মনে ভবিতব্যের আশ
বলেছিলো গণনা করে পরজন্মে হবে নরকবাস


পালিয়ে যাবার পথ যে খুঁজি নেইকো আমার জানা
ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি  বাড়াসনি আর দেনা !


আলোচনা -


ছড়াটা বেশ জমিয়ে মজা করে লেখা l তা বেশ l কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, এই ছড়া কোনভাবেই যেন কোনো বৌদির হাতে না পড়ে l যদি পড়ে, তখন যে মজাটা হবে, সেই মজা প্রকাশ করবার জন্য আবার একটা ছড়া লিখতে হবে l সেই ছড়াটা আবার এলিজি না হয়ে যায় l
এমনিতেই বিয়েকে আমরা পরিহাসছলে "দিল্লী কা লাড্ডু, জো খায়া, ও পস্তায়া / জো নেহি খায়া ও ভি পস্তায়া" বলে থাকি l অর্থাৎ বিয়ে হলো এমন আজব এক খাবার যা খেলেও আপশোস, না খেলেও আপশোস l তবু সবাই দেখি না খেয়ে আপশোস করার বদলে খেয়ে আপশোস করার দলে l কবিও সম্ভবত তাই l কি করি ভাই ! ঝুট ঝামেলা সামলে বিবাহিত জীবনের মজাটাও তো নিতে হবে l এই পৃথিবীতে মাত্র দুজন পরস্পরের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ l বিরাট সহায়, অবলম্বন l সুখ দুঃখের চির সাথী l এর তুলনায় আছোলা বাঁশ, সর্ষে ফুলের শোভা, আতঙ্ক কি সত্যিই নরকবাস l একটু তো বোঝাপড়া করতে হয় ! যেমন তৃতীয় স্তবকের শেষে বোবা না হয়ে বাবা হওয়ার সুযোগ ছিল l তাহলেই দেখা যেত, বাঁশ দিয়ে বেড়া হয়, সর্ষে ফুল দিয়ে সুস্বাদু বড়া হয়, আতঙ্কের আ সরে গিয়ে প্রায় সম উচচারিত  টঙ্ক অর্থাৎ  শিক্ষিতা চাকুরিজীবি সহধর্মিণী হলে আজকের এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসারে কিছু অতিরিক্ত টঙ্ক আসে, আর থাকলো নরকবাস, ওপরের তিনটি বোঝাপড়া সুসম্পন্ন হলে নরকের স্বর্গে পরিণত হতে সময় লাগে না l
আবারও বলছি লেখা ছড়াটা কোনভাবেই যেন কোনো  বৌদির হাতে না যায় l সেক্ষেত্রে উপরোক্ত প্রেসক্রিপসন কাজ করে না l তার দায়ও প্রতিবেদকের নয় l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১০
কবিতার নাম - বোধ আর বেধ  
কবির নাম - অনিরুদ্ধ বুলবুল
আলোচক  - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


প্রশান্তির সুচারু ছায়াপথে অন্তরেখার পলাতক বিভা
ছড়াক-না তাপসের তাপ, নেই ক্ষতি নেই মনস্তাপ।
বলয়ভেদি চেতনারে ইন্ধন করে
আজন্ম কালের তরে হারিয়ে যাবো।


অন্তহীন কসরতের এই জীবন-পাত জানি;
বেহুদা কুশিশ, হারাবোই একদিন শেষ ঠিকানায়
কারো ভালে ছাই-ঢিবি, কারো বা সাড়ে-তিন হাত
তবু কী-না ধৈর্য ধরে সব রেখা করে দিই কাত!


হাঁটি তো নিষেধের কাছাকাছি, নয়তো অন্তরেখায়
বুঝি না অচেনা স্রোত কী করে যে সময় বদলায়
মাঝে মাঝে বোধ জাগে; কবে হবো আমিও মানুষ
আমাতেও করবে বাস মান আর হুঁশ!


নিভু নিভু ক্রোধের আগুন - পুড়ে যাক ধূপ
মিটিমিটি জ্বলুক না তা, থাকবো নিশ্চুপ!


আলোচনা -


কবিতাটি পড়লাম বারকয়েক l সুপাঠ্য কবিতা l পড়তে ভালো লাগছে l তাই আবার পড়লাম l আলোচনায় যাচ্ছি l কিন্তু একটা খটকা থাকছে l কবি যে বোধ থেকে কবিতাটি লিখেছেন, এবং বারকয়েক কবিতাটি পড়ে আমার কবিতাটির সম্বন্ধে যে বোধ হলো, তার মধ্যে ভেদ হবে বুঝি l বোধের অনৈক্য হলে সঠিক বোধের জন্য কবির শরণ নিবো l
জীবনের অন্তিমলগ্নে এসে কবি জীবনসমাপ্তির রূপক পলাতক অন্তরেখার হাতছানি অনুভব করছেন l শেষ চলে যাবেন ভাবছেন l এই চলে যাবার বেলায় কোনো দুঃখ, মনস্তাপ নেই l আজন্ম লালিত চেতনাকে সম্বল করে চিরতরে হারিয়ে যেতে চান l
জীবনভর লড়াই-সংগ্রাম করেছেন l করেছেন অনেক ব্যর্থ প্রয়াস l সবশেষে জীবনের অনিবার্য পরিণতি ও যথাযথ সৎকার মেনে নিতে তাঁর আপত্তি নেই কোনো l
জীবনভর নিষেধের পথে চলে এখন স্ব-ইচ্ছায় অন্তরেখা  অভিমুখে চলমান কবি l পরিবর্তিত সময় l অতীতের পুনরালোচনা l ভিন্ন বোধের উদয় l জীবন সায়াণ্হে এসে মনুষ্যত্ব অর্জনের বাসনা এখনও প্রবল l
আধ্যাত্মিক ভাবনা থেকে ভাবিত হয়ে জীবনকে নিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন কবি l নশ্বর এই দেহের অন্ত তো নিশ্চিত l সত্যকে অনুমোদন করছেন কবি l তাই অনিবার্য ভাবেই   চলে যাবার কথা বলছেন l জীবনের তাপ স্তিমিত l আগুন নিভু নিভু l মিটিমিটি জ্বলছে l  ধূপের সৌরভে জীবনকে আবার ভালো লাগতে শুরু করেছে হয়তো l  ধূপ তো আবার শেষ যাত্রার সাথীও বটে ! মন পরিবেশ শুদ্ধ রাখারও l
কবি আর শেষ যাবার কথা বলছেন না l চুপ থাকছেন l
আমরাও তাই চাই কবি ! আমাদের প্রার্থনা, কবি বহু বহু বছর আমাদের সঙ্গে থাকুন l কবির সৃজনশীল কর্মের দীর্ঘায়ু কামনা করি l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১১
কবিতার নাম - উড়ুুক্কু শনির মুকুট
কবির নাম - অনিরুদ্ধ বুলবুল  
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা -


হে দুরন্ত বৈশাখ - শানিত তাপস,
উড়ুক্কু হে শনির মুকুট, হে বৈশাখ, রুদ্র-বৈশাখ।
বাঙালির কোটি প্রাণে জাগাও সৃষ্টির নব জোয়ার
পুরানের গ্লানি মুছে, ভরে তোল এ ধরা নব পল্লবে।
হে রুক্ষ, চণ্ডিরূপী আশীর্বাদের কোরক -
তোমার ভীমনাদী ত্রাস; তাপিত-দলিতের প্রাণে
আনুক সুরেলা শান্তির নিবিড় প্রচ্ছায়া।


তোমার করাল থাবায় ধুয়ে দাও আজ,
মুছে দাও যত আছে ক্লেদ, শত কালিমা।
তোমার হুঙ্কারে কেঁপে ওঠুক শ্বাপদের প্রাণ,
বিভীষণের ত্রাস, খাণ্ডব দাহের ভয়াল মূর্তি।
ভয়াল করাল থাবায় গৃহহীনে করো নাকো গৃহহারা
কিষাণের অন্ন নিয়ো না কেড়ে, ভাসিয়ো না জলে
প্রলয় নৃত্যে তোমার জেগে ওঠুক প্রাণের বিষাণ।


শত দীনতার করে অবসান ক্ষুদ্রতারে কর পদানত
আলোর আকাশে আজ বাজুক তোমার বীণ
দহন তাপে ভস্মিত করো মিথ্যার বোনা জটাজাল,
অন্তরে পোষা বিভেদের ক্লেদাক্ত দেয়াল -
ভেঙে দাও সব শ্রেণি-বিভেদের কারা-প্রাকার
উঁচু-নীচু সাদা-কালোর সব বাধা ব্যবধান।
ধুলিস্মাৎ কর ত্রাসিতের সৌর্যচূড়া দলিতের পদতলে।


আলোচনা -


একটা বছর যখন আসে, তার কাছে থাকে প্রার্থনা l যে বছরটা পেরিয়ে এলাম তার কতো ভূল ভ্রান্তি, শোষণ অত্যাচার সব বিদায় হোক l নতুন বছর আসুক নতুন প্রতিশ্রতি নিয়ে l মানবের কল্যাণ হোক l পুরাতনের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে সৃষ্টির নতুন জোয়ারে, নবপল্লবে ধরা ভরে উঠুক l বৈশাখের কাছে কবির প্রার্থণা সব শোষণ, অত্যাচার, অসাম্য দূর করে পৃথিবীতে শান্তি, সাম্য, ন্যায়, সকলের বিকাশ - এরকম দিন আসুক l কবিতার শব্দ চয়ন সুন্দর l ভাব দৃঢ়, স্পষ্ট l পাঠে মজা আছে l কোথাও বাধা পাই না l সুন্দর অনুভব l নতুন বছরের দিনে কবিতার বিষয় নির্বাচনটিও যথাযথ l
প্রিয় কবি বলেই কেবল একটি শব্দের প্রয়োগের বিষয়ে কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি l "বিভীষণ" শব্দটিকে দুটি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় l এক, ঘরশত্রু l যেহেতু তিনি রাবণের ভাই হওয়া সত্বেও লঙ্কার যুদ্ধে রামের পক্ষে গিয়েছিলেন l আর দ্বিতীয় অর্থটি হলো ধর্মের সাথী l রাবণ ছিলেন অন্যায়কারী l সীতাকে চুরি করে অন্যায়ভাবে আটকে রেখেছিলেন l বিভীষণ রাবণের এই আচরণ সমর্থন করেন নি l তিনি রাবণকে সদুপদেশ দিয়েছিলেন সীতাকে সসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে লঙ্কার যুদ্ধকে এড়াতে l কিন্তু রাবণ সে কথা শোনেন নি l অপরদিকে রামের লড়াই ছিলো নিজের অপহৃত স্ত্রীকে উদ্ধার করার জন্য l বিভীষণের মতে রাম ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে ছিলেন l তাই বিভীষণ সত্যের পক্ষে, ধর্মের পক্ষে, রামের পক্ষে গিয়েছিলেন l আপনি কবিতায় লিখেছেন "বিভীষণের ত্রাস" l উল্লিখিত কোনো অর্থেই বিভীষণ কখনো ত্রাস ছিলেন না l হয় তিনি "ঘরশত্রু বিভীষণ", না হয় "ধর্মের সাথী" l
যাই হোক l আমার যতটা জানা, বললাম l


একটি কবিতা ও তার ওপর আলোচনা - ১২
কবিতার নাম - অনুস্টুপ ছন্দ
কবির নাম - স্বপন কুমার দাস
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা  -


অনুষ্টুপ ছন্দে নিবিড় হয়ে
সমান্তরাল দুটো উত্তরীয় দুলছে
ফাগুনের ফেরারী হাওয়ায়।


সংপৃক্ত দ্রবনে আরো কিছু ইচ্ছে মিলিয়ে দিলে
অধঃক্ষেপন স্বাভাবিক।


জটিল কোন প্রেমকাহিনী দেখলে
হাততালি দিয়ে উঠে
মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক।


নিস্প্রদীপের মহড়া  আজকাল মনের গহনে।


চোখ বন্ধ থাকলেই অন্ধকারে মরুঝড়
সেখানে সবাই মুখ ঢেকে মরূদ্যান খোঁজে।


হাইওয়ে থেকে যেখানে গ্রামের দিকে পথ দ্বিখন্ডিত হয়েছে
সেখানে একটু  অন্যরকম হাওয়া
হয়ত‌ বেঁচে থাকার অনেকটা কাছাকাছি।


আলোচনা -


কবিতাটি পড়লাম l ভালো লাগলো পড়তে l আধুনিক কবিতা l মুক্তক ছন্দে লেখা l মানুষের বিচিত্র জীবন যাপন দেখেছেন কবি l তিনটি নির্দিষ্ট চিত্রকল্প ব্যবহার করে এই অসাম্য তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে মনে হলো l একদিকে খুশির বাতাবরণ, জটিল প্রেমকাহিনী দেখে দর্শক হাততালি দিচ্ছে, বিপরীত চিত্র পরেরটা যেখানে মনের গহনে নিষ্প্রদীপের মহড়া, অন্ধকারে মরুঝর এবং আর্ত মানুষের মরিয়া মরুদ্যান খোঁজার চেষ্টা l এখানে ভয়, আতঙ্ক, সন্ত্রাস, দারিদ্র্য, হতাশার পরিবেশ l
মাঝামাঝি অবস্থা গ্রামের দিকে l সেখানে হয়ত বেঁচে থাকার কাছাকাছি জীবনযাপন l কিন্তু সেখানে রাস্তা দ্বিখণ্ডিত হয় l এর অর্থ কি সেটা কবি ভালো জানবেন l তিনি কি অর্থে রাস্তা দ্বিখণ্ডিত বলেছেন l একটা অর্থ হতে পারে, মানুষ তার আদর্শ, তার মূল্যবোধ, তার মর্যাদাকে খণ্ডিত করছে এখানে তার বেঁচে থাকার রসদ যোগাড়ের জন্য l
দেশ জুড়ে, পৃথিবী জুড়ে যে অসাম্য রয়েছে মানুষের মধ্যে - তার সামর্থ্যে, তার আয়োজনে, তার জীবনযাপনে - সেই বিষমতার ছবিটাই কবি বোধ হয় তুলে ধরতে চেয়েছেন l