কবিতার নাম - আত্মবিলাপ
কবির নাম - মাইকেল মধুসূদন দত্ত
আলোচক - যাদব চৌধুরী


মূল রচনা :


আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু,হায়,
তাই ভাবী মনে?
জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,
ফিরাব কেমনে?
দিন দিন আয়ুহীন হীনবল দিন দিন ,--
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না? এ কি দায়!


রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাতি?
জাগিবি রে কবে?
জীবন-উদ্যানে তোর যৌবন-কুসুম-ভাতি
কত দিন রবে?
নীর বিন্ধু, দূর্বাদলে,নিত্য কিরে ঝলঝলে?
কে না জানে অম্বুবিম্ব অম্বুমুখে সদ্যঃপাতি?


নিশার স্বপন-সুখে সুখী যে কী সুখ তার?
জাগে সে কাঁদিতে!
ক্ষণপ্রভা প্রভা -দানে বাড়ায় মাত্ত আঁধার
পথিকে ধাঁদিতে!
মরীচিকা মরুদেশে,নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে--
এ তিনের ছল সম ছল রে এ কু-আশার।


প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাদে
কী ফল লভিলি?
জ্বলন্ত-পাবক-শিখা-লোভে তুই কাল ফাঁদে
উড়িয়া পড়িলি
পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়,ধাইলি,অবোধ,হায়
না দেখলি না শুনিলি,এবে রে পরাণ কাঁদে


বাকি কি রাখিলি তুই বৃথা অর্থ-অন্বেষণে,
সে সাধ সাধিতে?
ক্ষত মাত্ত হাত তোর মৃণাল-কণ্টকগণে
কমল তুলিতে
নারিলি হরিতে মণি, দঃশিল কেবল ফণী
এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন,কেমনে!


যশোলাভ লোভে আয়ু কত যে ব্যয়িলি হায়,
কব তা কাহারে?
সুগন্ধ কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধায়,
কাটিতে তাহারে?
মাৎসর্য-বিষদশন, কামড়ে রে অনুক্ষণ!
এই কি লভিলি লাভ,অনাহারে,অনিদ্রায়?


মুকুতা-ফলের লোভে,ডুবে রে অতল জলে
যতনে ধীবর,
শতমুক্তাধিক আয়ু কালসিন্ধু জলতলে
ফেলিস,পামড়!
ফিরি দিবি হারাধন,কে তোরে,অবোধ মন,
হায় রে,ভুলিবি কত আশার কুহক-ছলে!


আলোচনা :


বাংলা কবিতার জগতে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য চর্চার প্রাথমিক বছরগুলি সুখের ছিলো না l ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে খ্যাতি পেতে চেয়েছিলেন তিনি l সঙ্গে ছিলো তার অমিতব্যয়ী জীবনযাপন l এর জন্য কঠোর মূল্য দিতে হয়েছিল তাঁকে l ঋণগ্রস্ত কপর্দকহীন মাইকেলকে উদ্ধার করেছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয় l বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার মার্গদর্শন দিয়েছিলেন l বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেই শেষ পর্যন্ত মধুসূদন খ্যাতি পেয়েছিলেন l বেঁচে থাকার শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আপশোস করেছেন, আত্মবিলাপ করেছেন ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে যাবার তার ভুল প্রচেষ্টার বিষয়ে l শুধু ঐ বিষয়টি পরিষ্কার করতেই তিনি কিছু কবিতা-সনেট লিখেছেন l বর্তমান "আত্মবিলাপ"" কবিতাটি সেই শ্রেণীভুক্ত l
মধুকবি দুঃখ করে বলছেন, আশার ছলনায় ভুলে ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে যাওয়াটা তাঁর ভুল হয়েছিল l এ ভুলের সংশোধন করা বা সেই ক্ষতি পূরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, হারানো সময় তিনি ফিরিয়ে আনতে পারবেন না l ঐ ভুলের মাশুল যোগাতে তিনি দিন দিন আয়ুহীন ও হীনবল হয়েছেন l তবু খুব সহজে তাঁর ঐ নেশা কাটে নি l এই মোহ ত্যাগ করে সত্বর তিনি, তাঁর সেরা সময় থাকতে থাকতে, বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে আগ্রহী l সেইভাবে তিনি নিজের মনকে প্রস্তুত করেন l অলীক স্বপ্নের সুখ ক্ষণস্থায়ী l মোহ কেটে গেলেই দুঃখের শুরু l বিদেশ বিভুঁইয়ে খ্যাতির আশা মরিচীকার মতো, ছলনা l অর্থ আসে নি, যশ আসে নি l আর্থনৈতিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন l পদ্মফুল তুলতে গিয়ে বিষধরের দংশন পেয়েছেন l যশের লোভে নিজের আয়ু ক্ষয় করেছেন l অনাহার, অনিদ্রার কষ্ট ভোগ করেছেন l মুক্তার লোভে ধীবর গভীর জলে ডুব দেয় l সাধক স্রষ্টাদের মূল্যবান জীবন, তাদের অমূল্য সময় অনেক অনেক মুক্তার চেয়েও দামী l মরীচিকার পেছনে ছুটে এই মুক্তাসম জীবনের সময়কে নষ্ট করা বোকামী l তাই যে বোকামীটা কবি করে ফেলেছেন, তার জন্য এখন নিজেকে ভর্ত্সনা করছেন আত্মবিলাপের মাধ্যমে l
ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা ছেড়ে দিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন পাকাপাকি ভাবে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু করলেন, তখন বাংলা কবিতা ও কাব্য রচনার ক্ষেত্রে পয়ারের আধিপত্য l অন্তমিলযুক্ত পয়ারের একঘেয়েমি থেকে বাংলা কবিতাকে মুক্তি দিতেই যেন মাইকেলের উদয় l কবিতা রচনার ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োগ করলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ l অন্ত্যমিল বাদ গেল l কবিতার চরণকে ছন্দ ও যতি বিরামের কড়াকড়ি থেকে আরাম দেওয়া হলো l নানা অলঙ্কার প্রয়োগের দ্বারা কবিতায় ব্যবহৃত বাক্যকে উন্নত করা হলো l ঝোঁক অনুযায়ী যতি এবং অর্থ অনুযায়ী ছেদ ব্যবহৃত হলো, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ইত্যাদি l
বর্তমান কবিতাটিতে অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট দেখা গেলেও এটিতে কিন্তু অন্তমিল আছে, এক চরণ অন্তরে, abab-a এই pattern এ  l কেবল প্রতি স্তবকে পঞ্চম চরণটি বিচ্ছিন্ন l