http://www.bangla-kobita.com/ranjit2410/post20150914015106/


অভিশপ্ত
-------------------------
শ্রীরঞ্জি অারতিশঙ্কর


এমন কী স্নানের সময় জলের কাছেও
গোপন করেছি সংক্রামক মহারোগ;
প্রতিবেশী-বন্ধুদের সম্মুখে কোনও দিন
সংকোচ-বশত উন্মুদ্র করিনি করতল।
প্রখর অালোর নীচে কখনোও দাঁড়াইনি ত্রস্ত,
সুনিশ্চিত জানি যে ঐ তীব্র উজ্জ্বল
অালো চিনে নেবে,ঠিক অামার মুখশ্রীর
গুপ্ত রেখাগুলির ঘনাতিঘন তমসা-সংযোগ...


বৃক্ষেরা ভেবেছে অামি সহজ লোক,ভালো....
নিশ্চিন্তে তাই শ্যামশ্রী মঞ্জরি  পাঠায়--
নিদারুণ উত্তপ্ত,কিরণ-বিকিরণ অক্ষম;
অভিশপ,স্পর্শমাত্র সমস্ত জ্বলে-পুড়ে ছাই.....


--------------------------------------------


★★সূচনা বক্তব্যঃ
---------------------
"অভিশপ্ত" নামটি বড়ই নেতিবাচক।এই কবিতায় রয়েছে মাত্র দু'টি স্তবক।সাধারণত ছোট ছোট কবিতায় ভাবনার গভীরতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে।মাত্র বারোটি বাক্যে এই কবিতাকে বিন্যস্ত করা হয়েছে।


নামকরণঃ
----------------
অভিশপ্ত।যেকোন কবিতার নামকরণের সার্থকতা খুঁজতে গেলে একজন পাঠককে অবশ্যই সম্পূর্ণ কবিতাটির বাক্যবিন্যাস ও ভাব-ধারার প্রতি নজর রাখতেই হবে।নামকরণ কবিতার বিষয়-বস্তুর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়াই কাম্য।একটি কবিতা যখন রূপকের অাশ্রয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন নামকরণের সার্থকতা খুঁজে বের করা বেশ দুষ্কর বটে!


প্রথম স্তবকঃ
--------------------
হঠাৎ করেই যেন একটি বাক্য শুরু হয়ে গেলো----
"এমন কী স্নানের সময় জলের কাছেও
গোপন করেছি সংক্রামক মহারোগ"।--দুর্দান্ত চিত্রপট ও উপমা।


"গোপন করেছি"----এই শব্দবন্ধনের মাধ্যমে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে কবির অাত্ম-কথনের অাভাস।কবির নিজস্ব প্রতিচ্ছবি যেন ভেসে উঠবে সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন!(সাধারণত রূপক কবিতাগুলো সব পাঠকের বোধগম্য হয়ে উঠেনা)পাঠকদের মানসপটে।


"সংক্রামক মহারোগ"-----এই উপমাটি ভাবিয়ে তোলার মত।কীসের সংক্রামক মহারোগ? এটা কি কবির কোন নিজস্ব উপলব্ধি?নাকি অামাদের বিমর্ষ সমাজের দরুণ কবিমনের ব্যাকুলতা ভরা কোন সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত?


"প্রতিবেশী-বন্ধুদের সম্মুখে কোনও দিন
সংকোচ-বশত উন্মুদ্র করিনি করতল।"---এইখানে অাসলে দেখা যায় কবি নিজের প্রতি সন্তুষ্ট নন,যিনি লজ্জায় তাঁর করতল উন্মোচন করতে চাননা বন্ধুসুলভ মানুষদের কাছে।কিন্তু কেনো?এটা কি নিজের প্রতি অভিমান নাকি সমাজের প্রতি?


"প্রখর অালোর নীচে কখনোও দাঁড়াইনি ত্রস্ত,
সুনিশ্চিত জানি যে ঐ তীব্র উজ্জ্বল
অালো চিনে নেবে,ঠিক অামার মুখশ্রীর
গুপ্ত রেখাগুলির ঘনাতিঘন তমসা-সংযোগ..."--ভাবিয়ে তোলার মত চারটে লাইন।ভাবের গভীরতায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়না।সত্যি অনবদ্য।


অাবার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়---কবি প্রখর অালোর নীচে দাঁড়াতে চান না ভয়ে।কারণ ঐ অালো কবির মুখশ্রীর অাড়ালে যে অন্ধকারের গুপ্ত রেখাগুলি অাছে তা চিনে নিবে।অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে কবি নিজেকে অাড়ালে রাখতে পছন্দ করেন।তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যের অাড়ালে যে কলঙ্ক রয়েছে তা ঐ প্রখর অালো নিজ গুনে বুঝে যাবে। কিন্তু কবির মাঝে কীসের অন্ধকার?এর জন্য কারা দায়ী?


দ্বিতীয় স্তবকঃ
-----------------------
কবি চলে গেলেন বৃক্ষের কাছে অর্থাৎ প্রকৃতির কাছে।প্রকৃতি তাঁকে বিশ্বাস করে নিশ্চিন্তে শ্যামশ্রী মঞ্জরি পাঠায় কিন্তু ঐ রূপ শুধুই উত্তপ্ত;তবে তা কিরণ-বিকিরণ অক্ষম যা অালো দেয়ার ক্ষমতা রাখেনা।কেবল স্পর্শ করলেই জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায়।কেননা কবির হাতও যে অভিশপ্ত।


মন্তব্যঃ
-------------
এই কবিতাটি অাত্ম-দর্শন মূলক।রূপকের অাড়ালে ভেতরের সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে।সংশয়,ভয়,লজ্জা অহরহ কাজ করে হৃদয়ের সূক্ষ্ম চোরাস্রোতে।এ যেন একটি অায়না।প্রথাগত কৃষ্টি-কালচার ও সামাজিক বাস্তবতা অার চিরায়ত অন্তর্দ্বন্দ্ব বিদ্যমান প্রতিটি বাক্-বিন্যাসে।


সমালোচনাঃ
---------------------
কবির প্রতিটি বাক্যে ব্যাকরণগত(যেমন হাইফেন চিহ্নের প্রয়োগ)সঠিক হলেও কিছু কিছু শব্দচয়নে একটু কৃপনতা-বোধ পরিলক্ষিত হয়।যেমন--"ত্রস্ত"---এর মানে ভয়,ভীত,ত্রাস ইত্যাদি।ঐ জায়গায় "ত্রস্ত" না দিয়ে "ভয়ে" শব্দটি দিলেই বেশি মানানসই হতো।কবির কবিতায় প্রচ্ছন্ন ভাবের মাত্রাতিরিক্ততা পাঠকের মগজের কোষে অান্দোলন তুলে দেয়।পাঠক নিশ্চিৎ হাঁপিয়ে উঠবে পুরো কবিতার অাসল সারমর্ম উদ্ধার করতে।কবিতার প্রয়োজনে রহস্যভাবকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কবি যেন রহস্যটাকেই কবিতার মূল উপাদান করে ফেলেছেন।বক্তব্য ও বিষয়-বস্তু অারেকটু সহজ  হলে ভালো হয় যেন পুরো কবিতা পাঠ করার পর পাঠক যাতে কোনক্রমেই বলে না উঠে --কবিতাটি হৃদয়ের চেয়ে বেশি যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে।


সিদ্ধান্তঃ
-------------
শেষ লাইনটিতে এসেই কবিতার নামকরণ সার্থক।বিষয়-বস্তুর প্রতি নজর রেখে বলতে গেলে কিংবা বাংলা সাহিত্যের নানা ধারা-উপধারার কথা বিবেচনায় অানলে এই কবিতাটিকে সুন্দর ও অাকর্ষণীয় বললে অাশা করি কোন ভুল হবে না।


★★ অালোচনাটি একান্তই অামার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী।
★★বিতর্ক কাম্য নয়!